জাতীয় বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, তা শুধু বাজেটের প্রশংসাই নয়; বরং জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে আঞ্চলিক চাহিদার একটি বাস্তবসম্মত সংযোগও তুলে ধরেছে।
তিনি বাজেটকে একটি “স্বপ্নবিলাসী” ও সময়োপযোগী বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. এপিজে আব্দুল কালামের সেই বিখ্যাত উক্তির উল্লেখ করেন—“স্বপ্ন সেটা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটাই যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।” তার মতে, প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং বিভিন্ন অংশীজনের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফসল হিসেবে প্রণীত এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে সরকারের দুই বছরের স্বল্পমেয়াদি এবং পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এ প্রেক্ষাপটে শিশু খাদ্য, প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য ও শস্যের ওপর শুল্ক এবং কর হ্রাসের সিদ্ধান্তকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখতে সহায়ক হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ভূমিকা রাখবে।
ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি ওষুধ শিল্পের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামাল, বিশেষ করে এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) এবং শিল্পের যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানোর ফলে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে, রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে এবং দেশীয় বাজারে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাতীয় ইস্যুর পাশাপাশি তিনি মাগুরার দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যাগুলোর প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মাগুরা মেডিকেল কলেজে ইতোমধ্যে আটটি ব্যাচ ভর্তি হয়েছে এবং দুটি ব্যাচ সাফল্যের সঙ্গে পাসও করেছে। দেশের ৪৬টি মেডিকেল কলেজের মধ্যে এ কলেজের অবস্থানও প্রশংসনীয়। কিন্তু এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় শিক্ষার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই দ্রুত একনেক বৈঠকে প্রকল্প অনুমোদনের দাবি তিনি উত্থাপন করেন।
একইভাবে মাগুরার আইটি পার্ক প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের যুগে এ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে জেলার তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মাগুরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা কৃষিনির্ভর অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এ এলাকায় কোনো কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নেই। ফলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে আধুনিক ও গবেষণানির্ভর করতে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও তিনি সংসদে তুলে ধরেন।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও মাগুরা পিছিয়ে রয়েছে। জেলার একমাত্র টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে। বন্ধ মিল পুনরায় চালু করা এবং একটি মৌলিক শিল্পনগরী গড়ে তোলার দাবি স্থানীয় জনগণের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জেলার অর্থনৈতিক কাঠামোয় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতাও মাগুরার উন্নয়নের পথে অন্যতম বাধা। মাগুরা-শ্রীপুর সড়কের বেহাল অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে আছে। একই সঙ্গে নির্মিত রেললাইন ও স্টেশন পূর্ণাঙ্গ সংযোগ না পাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। রেল যোগাযোগকে যশোর, ঝিনাইদহ ও বৃহত্তর অঞ্চলের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করার বিষয়টি তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
খেলাধুলার ক্ষেত্রেও মাগুরার রয়েছে গৌরবময় অবদান। জাতীয় নারী ফুটবল ও ক্রিকেট দলে জেলার একাধিক খেলোয়াড় প্রতিনিধিত্ব করছেন। অনূর্ধ্ব-১৭ পর্যায়েও জাতীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে মাগুরায় একটি আধুনিক স্পোর্টস একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি যথার্থ বলেই প্রতীয়মান হয়।
জাতীয় বাজেট তখনই সফল হয়, যখন তা রাজধানীর সীমানা পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেনের বক্তব্যে যেমন জাতীয় অর্থনীতির প্রতি আস্থা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি মাগুরার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, যোগাযোগ ও ক্রীড়া উন্নয়নের বাস্তব চিত্রও উঠে এসেছে। এখন প্রয়োজন এসব প্রত্যাশাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ। তাহলেই স্বপ্নের বাজেট সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের বাজেটে পরিণত হবে।
লেখকঃ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

