ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

ভূরাজনীতির নতুন মানচিত্রে বাংলাদেশ: আত্মমর্যাদা, বাস্তববাদ ও কূটনীতির নতুন অধ্যায় 

কাজী জিয়া উদ্দিন
প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬, ১২:৫১ পিএম
কাজী জিয়া উদ্দিন। ছবি : সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে শক্তির বিন্যাস কখনো স্থির থাকে না। সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ঘটে, মিত্রতা বদলে যায়, নতুন জোট গড়ে ওঠে, পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান হয়। কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত থাকে—রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ। যে রাষ্ট্র নিজের স্বার্থকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং পরিবর্তিত বিশ্ববাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, তারাই ইতিহাসের গতিপথে টিকে থাকে এবং প্রভাব বিস্তার করে।

আজকের বিশ্ব সেই পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী একমেরুকেন্দ্রিক বা দ্বিমেরুকেন্দ্রিক শক্তি কাঠামো দ্রুত বদলে বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের প্রধান শক্তি, কিন্তু চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, আসিয়ানের অর্থনৈতিক শক্তি, মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠন এবং Global South-এর আত্মপ্রকাশ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিচ্ছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এগুলো একটি বৃহত্তর কৌশলগত রূপান্তরের অংশ, যেখানে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে অনুসারীর ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের স্বার্থ নির্ধারণকারী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে।

বিশ্বের অন্যতম সফল রাষ্ট্রনায়ক Lee Kuan Yew বলেছিলেন— "In international relations, there are no eternal friends and no eternal enemies. There are only eternal interests." এই বাস্তবতা আজ বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ, নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রচেষ্টা এবং একই সময়ে ভারতের কূটনৈতিক আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন—এসব ঘটনাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখলে বোঝা যায় যে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ করার পথে এগোচ্ছে। 

বিশ্বে বর্তমানে যে কূটনৈতিক মডেলটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত, সেটি হলো ভিয়েতনামের “Bamboo Diplomacy” বা বাঁশ কূটনীতি।

ভিয়েতনাম একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, আবার চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সহযোগিতা বজায় রেখেছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক সমানভাবে সক্রিয়। ফলাফল আজ সবার সামনে।

একসময়ের যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম আজ বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা যেমন ঝুঁকি তৈরি করে, তেমনি অকারণ বৈরিতাও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। আধুনিক কূটনীতির মূল শক্তি হলো ভারসাম্য।

এই কারণেই মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করাও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক সম্প্রসারণ সমান জরুরি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে একটি অনন্য সুবিধা দিয়েছে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এই দেশটি আজ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বৈশ্বিক আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, নীল অর্থনীতি, সাবমেরিন কেবল, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের ফলে বহু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এখন চীনের বাইরে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। ভিয়েতনাম সেই সুযোগের একটি বড় অংশ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে, যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, আইনের শাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।

চীন সফরে বিনিয়োগ অফিস প্রতিষ্ঠার ঘোষণা এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের উদ্যোগ ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে কূটনীতির প্রকৃত সাফল্য কেবল রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠক কিংবা লালগালিচা সংবর্ধনায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হয় বিনিয়োগের পরিমাণ, কর্মসংস্থানের সংখ্যা, প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাত্রা এবং জনগণের জীবনমানের উন্নতির মাধ্যমে।

Henry Kissinger-এর একটি বিখ্যাত মন্তব্য এখানে স্মরণীয়— "Foreign policy is domestic policy with its hat on." অর্থাৎ সফল পররাষ্ট্রনীতি শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশ যদি দুর্নীতি কমাতে পারে, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক কূটনীতির সুফল বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতাও গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিনের ভিসা জটিলতা, সীমান্ত উত্তেজনা, তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য এবং আস্থার ঘাটতি দুই দেশের সম্পর্কে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি চিরন্তন সত্য হলো—কোনো রাষ্ট্র কখনো শূন্যতায় অবস্থান করে না।

যখন একটি রাষ্ট্র তার বিকল্প অংশীদারিত্ব বাড়ায়, তখন অন্য রাষ্ট্রগুলোও তার গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা দৃশ্যমান। এটিকে কারও পরাজয় বা বিজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি বাস্তবতার স্বীকৃতি, যেখানে বাংলাদেশকে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বিশ্ব রাজনীতির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও একই বার্তা দেয়।

সৌদি আরব ও ইরানের পুনর্মিলন, BRICS-এর সম্প্রসারণ, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় Global South-এর উত্থান, আসিয়ানের অর্থনৈতিক সংহতি—সবই দেখায় যে রাষ্ট্রগুলো ক্রমশ আদর্শিক বিভাজনের পরিবর্তে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

একবিংশ শতাব্দীর সফল রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ নয়, সংযোগকে বেছে নিচ্ছে; আধিপত্য নয়, অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের জন্যও ভবিষ্যতের পথ সেখানেই।

চীন থেকে বিনিয়োগ, জাপান থেকে অবকাঠামো, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রযুক্তি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাজার, মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি ও বিনিয়োগ, ভারত থেকে আঞ্চলিক সংযোগ এবং আসিয়ান থেকে নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ—সবগুলোকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ একটি কার্যকর মধ্যম শক্তিতে পরিণত হতে পারে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মমর্যাদা।

আত্মমর্যাদা মানে অহংকার নয়; আত্মবিশ্বাস।

আত্মমর্যাদা মানে বিচ্ছিন্নতা নয়; সমতার ভিত্তিতে সহযোগিতা।

আত্মমর্যাদা মানে কারও বিরোধিতা নয়; নিজের স্বার্থকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার সক্ষমতা।

আমার কাছে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—বিশ্ব সেই রাষ্ট্রকেই গুরুত্ব দেয়, যে রাষ্ট্র নিজেকে গুরুত্ব দিতে শেখে। বাংলাদেশ আজ সেই শিক্ষা ধীরে ধীরে আয়ত্ত করছে। এই যাত্রা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ, অনেক সীমাবদ্ধতা এবং অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু সুযোগও কম নয়।

যদি জাতীয় স্বার্থ, বাস্তববাদ, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং সার্বভৌম সমতার নীতি অটুট রাখা যায়, তাহলে আগামী দশকে বাংলাদেশ কেবল দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবেই নয়, বরং সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

তখন বাংলাদেশের কূটনীতির মূল পরিচয় হবে না কোনো শক্তির ছায়ায় অবস্থান করা; বরং নিজস্ব শক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং প্রজ্ঞার ভিত্তিতে বিশ্বমঞ্চে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করা। সেই দিনই প্রমাণিত হবে—একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার আয়তনে নয়, তার আত্মমর্যাদা, দূরদর্শিতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতায় নিহিত।

লেখক: কাজী জিয়া উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি।