একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় প্রাকৃতিক সম্পদ, জনসংখ্যা কিংবা কৃষিনির্ভর উৎপাদনকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বর্তমান বিশ্বে একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে বৈশ্বিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে তার সংযুক্তির ওপর। যে দেশগুলো নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে দক্ষ অবকাঠামো, আধুনিক বন্দর, কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অংশে পরিণত করতে পেরেছে, তারাই অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফলে আজ কানেক্টিভিটি কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
এই বাস্তবতায় প্রস্তাবিত চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ করিডোর বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। এটি কেবল তিনটি দেশের মধ্যে একটি সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করার সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি কার্যকর স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগ গড়ে উঠতে পারে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় নতুন গতি সঞ্চার করবে।
চীনের জন্য এই করিডোরের গুরুত্ব বোঝার জন্য তার বহুল আলোচিত "মালাক্কা ডিলেমা" সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এবং জ্বালানি আমদানির অধিকাংশই মালাক্কা প্রণালী দিয়ে পরিচালিত হয়। কিন্তু এই সমুদ্রপথ অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কোনো আঞ্চলিক সংঘাত, নৌ অবরোধ কিংবা বৈশ্বিক উত্তেজনার সময় এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে চীনের অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণেই চীন দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন রুট গড়ে তোলার কৌশল অনুসরণ করছে। মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর, সেখানে নির্মিত তেল ও গ্যাস পাইপলাইন এবং সম্ভাব্য স্থল করিডোর সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ। বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে চীনের জন্য বঙ্গোপসাগরে আরও কার্যকর প্রবেশাধিকার তৈরি হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি আংশিকভাবে কমবে।
তবে এই করিডোরের প্রকৃত গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য আরও বিস্তৃত। এটি কেবল চীনের একটি বিকল্প বাণিজ্যপথ নয়; বরং বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে আমদানি-রপ্তানির সময় ও ব্যয় কমবে, সরবরাহ শৃঙ্খল আরও দক্ষ হবে এবং উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে। এর ফলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাত আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে কেবল ভোক্তানির্ভর বাজার থেকে উৎপাদন, পরিবহন ও লজিস্টিকসকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের সুযোগ পাবে। আধুনিক বন্দর, কনটেইনার টার্মিনাল, গুদামজাতকরণ, কোল্ড চেইন, মালবাহী রেলপথ এবং ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা গড়ে উঠলে নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি হাজার হাজার দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ করিডোরটি শুধু পণ্য পরিবহনের রুট হবে না; বরং এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে শিল্প, সেবা, পরিবহন, ব্যাংকিং, বীমা, পর্যটন এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই সম্ভাবনাকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলেছে। পশ্চিমে ভারত, পূর্বে মিয়ানমার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর—এই অবস্থান দেশটিকে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই ভৌগোলিক সুবিধা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যায়নি। চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ করিডোর সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার একটি বাস্তব সুযোগ এনে দিতে পারে।
করিডোরটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের মাধ্যমে থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং বৃহত্তর আসিয়ান অঞ্চলের বাজারে প্রবেশ আরও সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক অর্থনীতি, ব্লু ইকোনমি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এ ধরনের সংযোগ কেবল বাণিজ্য বৃদ্ধি করবে না; বরং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণেও সহায়ক হবে। কারণ বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সাধারণত এমন দেশেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়, যেখানে উৎপাদনের পাশাপাশি আঞ্চলিক বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার এবং দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে BIMSTEC, BBIN এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতা উদ্যোগের সদস্য। কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা মূলত নির্ভর করে বাস্তব যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর। নতুন করিডোর এই উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় সৃষ্টি করতে পারলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে পণ্য, সেবা, মানুষ এবং বিনিয়োগের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক একটি নতুন অর্থনৈতিক বলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হবে।
এই করিডোরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশ–মিয়ানমার সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা। গত কয়েক দশকে সীমান্ত নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক প্রত্যাশিত মাত্রায় উন্নত হয়নি। কিন্তু অর্থনীতির একটি স্বীকৃত বাস্তবতা হলো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে পারস্পরিক স্বার্থ যত বৃদ্ধি পায়, সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতার ক্ষেত্রও তত বিস্তৃত হয়।
মিয়ানমারের অর্থনীতি এখনও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশ দ্রুত বর্ধনশীল উৎপাদন অর্থনীতি হিসেবে নতুন বাজার ও নতুন যোগাযোগের সন্ধান করছে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে করিডোরটি দুই দেশের জন্যই পারস্পরিক লাভজনক হতে পারে। সীমান্ত বাণিজ্য বৃদ্ধি, বৈধ পণ্য পরিবহন, যৌথ বিনিয়োগ, পর্যটন এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতা দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা বাড়াবে। ইতিহাস বলে, অর্থনৈতিকভাবে আন্তঃনির্ভরশীল দেশগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদে বিরোধের পরিবর্তে সহযোগিতার পথেই এগোতে বেশি আগ্রহী হয়। ফলে এই করিডোর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধিরও একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটের প্রেক্ষাপটেও এই করিডোর বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। মিয়ানমারের ওপর চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য।
কিয়াউকফিউ বন্দর, জ্বালানি পাইপলাইন এবং অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ যদি চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে, তাহলে সেই সম্পর্ককে কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে বেইজিংকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করা সম্ভব হতে পারে।
অবশ্য এটিকে কোনো "স্বয়ংক্রিয় সমাধান" হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নির্ভর করবে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন অংশীদারের সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক যত শক্তিশালী হবে, ততই দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের আলোচনার পরিসর বৃদ্ধি পাবে। সেই সুযোগকে বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে কাজে লাগানোই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বের অর্থনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে, ভৌগোলিক অবস্থান নিজে কোনো দেশের সম্পদ নয়; বরং পরিকল্পিত অবকাঠামো, কার্যকর নীতি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেই অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করাই প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি। সুয়েজ ও পানামা খাল বৈশ্বিক বাণিজ্যের কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে। একইভাবে কাজাখস্তান, তুরস্ক ও ভিয়েতনাম উন্নত যোগাযোগ অবকাঠামো, শিল্পায়ন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, শুধু করিডোর নির্মাণই যথেষ্ট নয়; এর সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে আধুনিক বন্দর, দক্ষ কাস্টমস, উন্নত লজিস্টিকস, সমন্বিত শিল্পনীতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা অপরিহার্য।
চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ করিডোরের সবচেয়ে জটিল দিকটি অর্থনীতি নয়, বরং ভূরাজনীতি। বর্তমান বিশ্বে বন্দর, জ্বালানি করিডোর এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে ঘিরে যে প্রতিযোগিতা চলছে, সেখানে এই করিডোর বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশের অংশ হয়ে উঠতে পারে। চীনের জন্য এটি বঙ্গোপসাগরে বিকল্প প্রবেশাধিকার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অন্যদিকে ভারতের দৃষ্টিতে বঙ্গোপসাগর তার কৌশলগত প্রভাব বলয়ের অংশ, এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভারতের পূর্বমুখী নীতি বাস্তবায়নে মিয়ানমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে ভারত কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট প্রকল্প-সহ বিভিন্ন সংযোগ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, ফলে চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পেলে নয়াদিল্লির উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল একটি উন্মুক্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক কাঠামোর ওপর জোর দেয়। তাই বঙ্গোপসাগরে চীনের অবকাঠামোগত উপস্থিতি বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রও তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই নিজ নিজ কৌশলে এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত পথ হলো করিডোরকে কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে না দেখে একটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প হিসেবে এগিয়ে নেওয়া।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ "সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়" নীতি অনুসরণ করে এসেছে। বর্তমান বাস্তবতায় সেই নীতিকে আরও বাস্তবভিত্তিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকেন্দ্রিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ সমানভাবে জরুরি। কারণ বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য বহুমুখী অংশীদারিত্বই সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল।
এখানে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। করিডোরের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক মূল্য চীনের জন্য যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি কৌশলগত সম্পদ। ফলে বাংলাদেশকে শুধু ট্রানজিট সুবিধা প্রদানকারী রাষ্ট্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং প্রতিটি চুক্তিতে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, স্থানীয় শিল্পের অংশগ্রহণ, গবেষণা সহযোগিতা এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
করিডোরের সঙ্গে সমন্বয় করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপার্ক ও লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলা গেলে বিদেশি বিনিয়োগ কেবল অবকাঠামো নির্মাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং উৎপাদন, রপ্তানি এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থা, একক ডিজিটাল বাণিজ্য প্ল্যাটফর্ম, দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং রেল–সড়ক–নৌপথের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় করিডোরের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে না।
তবে এই করিডোরের সম্ভাবনার পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত করিডোরের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্ত অপরাধ, মানবপাচার ও মাদক চোরাচালানের মতো নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে কার্যকর নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। এছাড়া বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়াতে স্বচ্ছ ব্যয়–সুবিধা বিশ্লেষণ, আর্থিক টেকসইতা এবং বিকল্প অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি, বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু একটি ট্রানজিট রুটে সীমাবদ্ধ না থেকে করিডোরকে কেন্দ্র করে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও আধুনিক লজিস্টিকসের মাধ্যমে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন ও বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হওয়া।
পরিশেষে বলা যায়, চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ করিডোর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সুযোগ, যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য, উৎপাদন ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক সুফল ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের মধ্যে বিচক্ষণ সমন্বয়, স্বচ্ছ ও টেকসই বিনিয়োগ, দক্ষ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক বহুমুখী কূটনীতি অপরিহার্য। শেষ পর্যন্ত করিডোরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার ভৌগোলিক অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত সক্ষমতায় রূপান্তর করতে পারে তার ওপর।
লেখক: ড. মো. মিজানুর রহমান, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট।

