প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বর্ষা যেমন আমাদের সুজলা-সুফলা রূপ দেয়, তেমনি মাঝেমধ্যে তা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে কেড়ে নেয় মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা। সাম্প্রতিক সময়ে অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং তীব্র জলাবদ্ধতা দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বানের জলে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের সোনালী স্বপ্ন, মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে উঁচু সড়ক কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে উপগত হওয়া বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ মানবিক ও প্রশাসনিক তত্পরতা শুরু হয়েছে। মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মাঠ প্রশাসনকে কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুর্যোগের এই কঠিন মুহূর্তে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোই এখন রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের প্রধানতম কর্তব্য।
রোববার এক উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল সভায় প্রধানমন্ত্রী দেশের আট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জনসহ মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন। এই সভার মূল সুরই ছিল—বিপন্ন মানুষের সেবায় কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি বরদাশত করা হবে না। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের হাত নেই, কিন্তু মানুষের আন্তরিকতা ও দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি ও মানুষের কষ্টকে অবশ্যই লাঘব করা সম্ভব। তাই প্রতিটি সরকারি সংস্থাকে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি বা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমন্বিতভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি একেক অঞ্চলে একেক রকম রূপ ধারণ করেছে। চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় জমে থাকা জল ধীরগতিতে নামতে শুরু করলেও মানুষের দুর্ভোগ এখনই কমছে না। ঘরবাড়ি থেকে পানি নামার পর পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব এবং ঘরদোর পুনর্নির্মাণের এক নতুন যুদ্ধ শুরু হবে সেখানে। অন্যদিকে, সিলেট অঞ্চলের পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। বানের জলের তোড়ে কখন কার বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, সেই আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের। একই সাথে দেশের উত্তরের রংপুর বিভাগেও নতুন করে জলাবদ্ধতার কালো ছায়া নামতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার করা এবং বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে আপদকালীন প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা।
ত্রাণ কার্যক্রম কেবল কিছু শুকনো খাবার বিতরণের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি এই মুহূর্তে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। বন্যাকবলিত প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় যেখানে যাতায়াতের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে, সেখানে স্পিডবোট কিংবা নৌকার মাধ্যমে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল, শিশুখাদ্য এবং জীবনরক্ষাকারী ওষুধ পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বিশুদ্ধ পানির অভাবে যেন কোনো এলাকায় ডায়রিয়া বা অন্যান্য মহামারীর বিস্তার না ঘটে, সেদিকে সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি, হাজারো মানুষ যেখানে গাদাগাদি করে আশ্রয়কেন্দ্রে দিনাতিপাত করছে, সেখানকার পরিবেশকে মানবিক ও বাসযোগ্য রাখা এক বড় চ্যালেঞ্জ। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত স্যানিটেশন বা টয়লেটের ব্যবস্থা করা, আলোর জন্য বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা রাখা এবং নারীদের অবমাননাকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা প্রয়োজন।
একটি দুর্যোগ যখন আঘাত হানে, তখন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়ে। অবুঝ শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের কষ্ট ও ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। উদ্ধার অভিযান থেকে শুরু করে আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো শিশু যেন খাদ্যের অভাবে পুষ্টিহীনতায় না ভোগে এবং কোনো গর্ভবতী নারী যেন জরুরি সময়ে চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করার জন্য মাঠ পর্যায়ের নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
মানুষের এই চরম বিপদের দিনেও এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী ও সুযোগসন্ধানী মানুষ সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। দুর্যোগের অন্ধকার সুযোগ নিয়ে চুরি, ডাকাতি কিংবা সরকারি ত্রাণ আত্মসাতের মতো জঘন্য অপরাধ রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে হবে। অতীতে অনেক সময় দেখা গেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যখন ত্রাণের জন্য হাহাকার করে, তখন প্রভাবশালী বা চাটুকার শ্রেণীর মানুষ সেই সুফল ভোগ করে। এবার যেন তার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য ত্রাণ বিতরণের তালিকায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। চাল বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যেন বাজার অস্থির করতে না পারে, সেজন্য জেলা প্রশাসনের নিয়মিত মোবাইল কোর্ট বা বাজার তদারকি জোরদার করা আবশ্যক।
পরিশেষে বলা যায়,বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করেই এ দেশের মানুষ আবহমানকাল ধরে বেঁচে আছে। তবে প্রতি বছর ত্রাণের অপেক্ষায় হাত পেতে থাকার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা বেশি জরুরি। নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং বা খনন কার্য পরিচালনা করা, দেশের সব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধকে আধুনিক ও শক্তিশালী প্রযুক্তিতে পুনর্নির্মাণ করা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও জনবান্ধব করে গড়ে তোলা সময়ের দাবি। একই সাথে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান শ্রেণী, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং তরুণ ছাত্রসমাজকে এই মানবিক সংকটে এগিয়ে আসতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সহমর্মিতা এবং সততার মাধ্যমেই আমরা বন্যাকবলিত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারি এবং তাদের জানমালের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারি।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

