শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকারই শুধু নয়, একটি শিশুকে সুনাগরিক ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার। পৃথিবীর যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত ও প্রযুক্তিবান, সে জাতি তত উন্নত। আধুনিক বিশ্ব শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ করে আজ সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছেছে।
আর আমরা স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজও এ দেশে শিক্ষার অধিকার রক্ষা, নৈরাজ্য বন্ধ এবং শিক্ষা ক্ষেত্রের পর্বতসম বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আন্দোলন করতে হয়। শিক্ষকদের মুখোমুখি হতে হয় পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির। জাতির কারিগরদের যখন নিজেদের অধিকারের জন্য এভাবে অশ্রু ও রক্ত ফেলতে হয়, তখন জাতি হিসেবে আমাদের আত্মমর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সংকটের মূলে জরাজীর্ণ নীতি ও অব্যবস্থাপনা
আমাদের শিক্ষার সার্বিক অবস্থা আজ যে নাজুক ও হতাশাজনক রূপ নিয়েছে, তার জন্য মূলত দায়ী দীর্ঘদিনের ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষানীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কাঠামোগত অব্যবস্থাপনা। বর্তমান শিক্ষা প্রশাসন শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে 'নকল' নামক ক্যানসার দূর করতে এবং পরীক্ষা পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনতে কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু শুধু পরীক্ষার হল পরিচ্ছন্ন রাখাই যথেষ্ট নয়; জরাজীর্ণ ও ঘুণে ধরা শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি।
শহর বনাম গ্রাম: এক দেশে দুই নীতি
বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, এক দেশে দুই রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে। শহরের সামর্থ্যবান পরিবারের সন্তানেরা সাধারণত সরকারি ও নামী-দামী স্কুল-কলেজে পড়ে রাষ্ট্রের সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা (যেমন- মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ল্যাব, দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক) ভোগ করছে।
বিপরীতে, দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থী—যারা গ্রামগঞ্জে বসবাস করে—তাদের পড়তে হচ্ছে বেসরকারি (এমপিওভুক্ত ও নন-এমপিও) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। গ্রামীণ অঞ্চলের বহু বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ নেই। কোথাও উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ ও আসবাবপত্র নেই, কোথাও বিজ্ঞানাগার বা কম্পিউটার ল্যাব কেবলই স্বপ্ন। সবচেয়ে বড় সংকট হলো তীব্র শিক্ষকস্বল্পতা। গণিত, বিজ্ঞান বা ইংরেজির মতো আবশ্যিক বিষয়েও বহু প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পদ শূন্য পড়ে থাকে।
বৈষম্যের অর্থনীতি: দরিদ্রের পকেট কাটছে বেসরকারি শিক্ষা
গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশ পরিবারই দারিদ্র্যসীমার নিচে বা নিম্নবিত্ত স্তরে জীবনসংগ্রাম করছে। যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে সন্তানদের শিক্ষার জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা যেখানে নামমাত্র খরচে পড়ছে, সেখানে বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষার্থীদের বেতন, সেশন ফি এবং আনুষঙ্গিক খরচ জোগাতে দরিদ্র অভিভাবকদের পকেট খালি হচ্ছে। অথচ, এই চরম সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ শিক্ষার্থীকে শহরের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীর সাথে একই সিলেবাস এবং একই প্রশ্নপত্রে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। এটি কি সামাজিক অবিচার নয়?
উল্টো রথের যাত্রা বন্ধ হোক
সামাজিক ন্যায়বিচারের নিয়ম হওয়া উচিত ছিল—দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানেরা পড়বে সম্পূর্ণ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়, আর সামর্থ্যবান ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সন্তানেরা প্রয়োজনে নিজস্ব ব্যয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়বে। কিন্তু আমাদের দেশে ঘটছে ঠিক তার উল্টো। এই চরম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বজায় রেখে একটি সাম্যবাদী ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠন অসম্ভব।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি জনদাবি ও স্থায়ী সমাধান
শিক্ষা ক্ষেত্রের এই নৈরাজ্য ও বৈষম্য দূর করতে সরকারের নীতি-নির্ধারক মহল ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি জোরালো দাবি জানাচ্ছি।
১. শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ জাতীয়করণ: বৈষম্যের স্থায়ী অবসানের একমাত্র পথ হলো দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাকে পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণ 'জাতীয়করণ' করা।
২. অন্তর্বর্তীকালীন পুনর্বিন্যাস (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড): যদি একযোগে জাতীয়করণ সম্ভব না হয়, তবে শহরের বড় বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত বা প্রাইভেট ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেওয়া হোক। এবং সেখান থেকে সাশ্রয় হওয়া রাষ্ট্রীয় বাজেট দিয়ে গ্রামগঞ্জের পিছিয়ে পড়া বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অনতিবিলম্বে জাতীয়করণ করা হোক।
শহর কিংবা গ্রাম—সব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা যখন একই ছাতার নিচে সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে, তখনই শিক্ষায় একটি সুস্থ ও প্রকৃত প্রতিযোগিতা শুরু হবে। সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত করতে এবং একটি মেধাবী ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে সরকারকে এই বিষয়ে দ্রুত, সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতেই হবে।
লেখক: মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন
প্রচার সম্পাদক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি) শিক্ষক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

