ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

কালো রাত থেকে মুক্তির আলো

আসাদুজ্জামান তপন
প্রকাশিত: মার্চ ২৬, ২০২৬, ০১:২১ পিএম
প্রতীকী ছবি

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ—বাংলার ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় রাত। এই রাতটি পরিচিত অপারেশন সার্চলাইট নামে। গভীর রাতে যখন ঢাকার মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন হঠাৎ করেই নেমে আসে অমানবিক এক তাণ্ডব। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ট্যাঙ্ক, মেশিনগান আর ভারী অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর।

এই অভিযানের মাধ্যমে তারা ঢাকাসহ সারা দেশে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পুলিশ ও সাধারণ মানুষ নির্বিচারে হত্যার শিকার হন। মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নকে শুরুতেই দমন করা। কিন্তু এই বর্বরতা বরং মুক্তির সংগ্রামকে আরও তীব্র করে তোলে এবং শুরু হয় দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

সেই রাতেই পাকিস্তানি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিশেষভাবে হামলা চালিয়ে জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)সহ বিভিন্ন আবাসিক হলে ছাত্রদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করা হয়। অনেক শিক্ষককেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় অবস্থানরত ইপিআর সদস্যদের ওপরও অতর্কিত আক্রমণ চালানো হয়।

এই বর্বরতা শুধু একটি শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই ধরনের হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। বিশ্ব ইতিহাসে এটি অন্যতম নির্মম গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা দেখে সারা দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে। এই দিনটি তাই শুধু শোকের নয়, বরং প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

এই নারকীয় অভিযানে কেবল ঢাকাতেই হাজার হাজার নিরীহ মানুষ প্রাণ হারান। পুরো দেশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে টেলিফোন, টেলিগ্রাম ও রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে রাজধানী ঢাকাকে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা করে রেখে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের হত্যাযজ্ঞ নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে চেয়েছিল।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরাও ছিল এই হত্যাযজ্ঞের শিকার। ইতিহাসের আলো ছড়ানো মানুষগুলোকে নির্মমভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। সেই রাতেই নিভে যায় বহু সম্ভাবনার প্রদীপ।

ঢাকার রাজপথ ও অলিগলি রক্তে লাল হয়ে ওঠে। ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে রাতের আকাশ। নিরীহ নারী, শিশু—কেউই রক্ষা পায়নি এই বর্বরতা থেকে। মানুষ দিশাহারা হয়ে ছুটে বেড়ায়, কিন্তু কোথাও নিরাপত্তা ছিল না।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন বাঙালি পুলিশ সদস্যরা, কিন্তু ভারী অস্ত্রের সামনে তাদের সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ টেকেনি। তবুও তাদের সাহসিকতা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। একইভাবে পিলখানাতেও আক্রমণ চালানো হয়, যেখানে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদস্যদের ওপর নৃশংস হামলা হয়। শহরের প্রতিটি প্রান্তে যেন মৃত্যুর ছায়া নেমে আসে।

সেই রাত ছিল শুধু হত্যার নয়, বরং একটি জাতিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে দমন করা যায়নি। বরং এই নিষ্ঠুর গণহত্যাই স্বাধীনতার সংগ্রামকে আরও তীব্র করে তোলে।

২৫ মার্চের সেই কালরাত আজও বাঙালির স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে—শোক, বেদনা আর প্রতিবাদের এক অনিঃশেষ প্রতীক হয়ে। এই রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার মূল্য কতটা গভীর, আর সেই মূল্য দিতে হয়েছে কত অগণিত প্রাণের বিনিময়ে।