দিল্লি বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সাম্পতিক ঘটনাটি কোনোভাবেই নিছক প্রশাসনিক বিভ্রাট, ইমিগ্রেশন জটিলতা কিংবা দাপ্তরিক ভুল হিসেবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনোভাব, সংবেদনশীলতা এবং কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আগাম অবহিত করার পরও একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেওয়া, দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখা এবং পরে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে অনুমতি দেওয়ার ঘটনাকে শুধুমাত্র ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে আখ্যায়িত করা সত্যের প্রতি অবিচার হবে। কারণ এখানে বিব্রত হয়েছেন শুধু একজন ব্যক্তি নন; অপমানিত হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মর্যাদা, আহত হয়েছে ১৮ কোটি মানুষের জাতীয় আত্মসম্মান।
একজন সাধারণ যাত্রীর ক্ষেত্রে এমন ঘটনা প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারত। কিন্তু যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একটি দেশের সরকারি প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছেন, তখন এটি আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রটোকল কেবল কাগজে লেখা কিছু নিয়ম নয়; এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা এবং মর্যাদার প্রতীক। আর দিল্লির এই আচরণ সেই প্রতীকের ওপরই আঘাত হেনেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ, জটিল এবং আবেগঘন। কিন্তু ইতিহাসের ঋণ বর্তমানের অসম্মানকে বৈধতা দিতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যতই উজ্জ্বল হোক, তার আড়ালে বর্তমানের অবজ্ঞা ও ঔদ্ধত্যকে আড়াল করার কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃত বন্ধুত্ব কখনো প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক নয়; এটি সমমর্যাদার দুই পক্ষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যখন একটি রাষ্ট্র বারবার নিজেকে বড় এবং অপর রাষ্ট্রকে ছোট হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে, তখন বন্ধুত্বের ভাষা ধীরে ধীরে আধিপত্যের ভাষায় পরিণত হয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে। সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা, বাণিজ্যিক বৈষম্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যের বিতর্কের মধ্যেই এবার যুক্ত হলো দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনা। ফলে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত অপমান নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষের ওপর নতুন একটি স্তর।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো এই ঘটনার সময়কাল। মাত্র কয়েক দিন আগে ঢাকায় ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার মিস্টার ত্রিবেদী অত্যন্ত আবেগময় ভাষায় বলেছিলেন—‘একই আকাশ, একই বাতাস।’ তিনি দুই দেশের বন্ধুত্ব, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং হৃদ্যতার কথা বলেছিলেন। তার কথায় ছিল কবিতার সুর, কূটনৈতিক সৌন্দর্য এবং প্রতিবেশীসুলভ আন্তরিকতার আবরণ।কিন্তু বাস্তবতা কখনো কখনো কবিতার মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে।
মিস্টার ত্রিবেদীর সেই ‘একই আকাশ, একই বাতাস’-এর রেশ এখনো বাতাসে ভাসছে। বন্ধুত্বের সেই কাব্যিক উচ্চারণের প্রতিধ্বনি এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। অথচ এর মধ্যেই তার সরকারের অধীনস্থ কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের একজন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিকে দিল্লি বিমানবন্দরে আটকে দেয়। ফলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এতদিন আমরা কি বন্ধুত্বের ভাষা শুনেছি, নাকি সৌজন্যের মোড়কে লুকিয়ে থাকা এক ধরনের রাজনৈতিক ভণ্ডামি?
কূটনীতিতে সুন্দর বাক্যের মূল্য আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় মূল্য আচরণের। কারণ রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র তার বক্তৃতায় নয়, তার ব্যবহারে প্রকাশ পায়। যদি সত্যিই একই আকাশের নিচে সমমর্যাদার বন্ধুত্ব বিদ্যমান থাকে, তাহলে এমন অপমানজনক ঘটনার জন্ম হয় কীভাবে? আর যদি এটি কেবল প্রশাসনিক ভুল হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভুল এত বড় হলো কীভাবে যে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিনিধিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অপদস্থ হতে হলো?
বাংলাদেশের মানুষ কবিতা শুনতে চায় না, সম্মান দেখতে চায়। বন্ধুত্বের গান নয়, মর্যাদার প্রতিফলন দেখতে চায়। কারণ একই আকাশের নিচে বাস করলেই সবাই সমান হয় না; সমান হতে হলে পরস্পরকে সমান মর্যাদা দিতে হয়।
দিল্লির সাম্প্রতিক আচরণ শুধু দুঃখজনক নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা ও ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ। একজন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাকে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া নিছক প্রশাসনিক ভুল নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। তাই এই ঘটনাকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ আজ আর কারও করুণা বা অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্র নয়। অর্থনীতি, কূটনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। ফলে বাংলাদেশের প্রতিনিধির সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ মানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গেই অসম্মানজনক আচরণ।
মাত্র কয়েক দিন আগে ‘একই আকাশ, একই বাতাস’ বলে বন্ধুত্বের কবিতা শোনানো হয়েছিল। কিন্তু কূটনীতিতে কবিতার চেয়ে বাস্তবতা অনেক বড়। যদি সত্যিই একই আকাশের নিচে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, তাহলে এমন ঘটনা ঘটার কথা নয়। আর যদি ঘটে, তাহলে তার জন্য স্পষ্ট ব্যাখ্যা, দুঃখ প্রকাশ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
বাংলাদেশের জনগণ বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়। সহযোগিতা চায়, কিন্তু মাথা নত করে নয়। সুসম্পর্ক চায়, কিন্তু অবজ্ঞা সহ্য করে নয়।
এই ঘটনার পর শুধু কূটনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের উচিত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাবি করা, প্রয়োজনে বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলেও উত্থাপন করা এবং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া—বাংলাদেশের মর্যাদা নিয়ে কোনো ধরনের খেলা বরদাশত করা হবে না।
কারণ রাষ্ট্রের সম্মান কোনো সরকারের নয়, কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তিরও নয়; এটি ১৮ কোটি মানুষের সম্মিলিত আত্মমর্যাদার প্রতীক।
দিল্লিকে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে—বাংলাদেশ আর সেই রাষ্ট্র নয়, যাকে উপেক্ষা করেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়। এটি এখন একটি আত্মবিশ্বাসী, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি, একটি কৌশলগত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান; কোনো ধরনের ঔদ্ধত্য, অভিভাবকসুলভ মানসিকতা কিংবা অবজ্ঞা নয়।
ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্ব চায়, তবে তাকে প্রথমেই তার আচরণে সেই সম্মানের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। কারণ ইতিহাসের স্মৃতি দিয়ে বর্তমানের অসম্মানকে ঢেকে রাখা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের অবদান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই অবদান কোনো রাষ্ট্রকে আরেকটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা খর্ব করার নৈতিক অধিকার দেয় না।
বাংলাদেশের জনগণ কখনো বৈরিতা চায় না। তারা প্রতিবেশীর সঙ্গে শান্তি, সহযোগিতা এবং বন্ধুত্ব চায়। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো দুই সমমর্যাদার রাষ্ট্রের মধ্যে; একপক্ষের দয়া আর অন্যপক্ষের নীরব সহনশীলতার ওপর নয়।
আজ প্রশ্নটি শুধু জাহেদ উর রহমানকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি বাংলাদেশের মর্যাদা নিয়ে। প্রশ্নটি এই রাষ্ট্রের পতাকা নিয়ে। প্রশ্নটি ১৮ কোটি মানুষের আত্মসম্মান নিয়ে।
যে জাতি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে, স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে, গণতন্ত্র ও মর্যাদার জন্য বারবার সংগ্রাম করেছে, সেই জাতি অপমানের বিনিময়ে বন্ধুত্ব কিনতে শেখেনি। বাংলাদেশ বন্ধুত্বের মূল্য বোঝে, কিন্তু আত্মসম্মানের মূল্য তার চেয়েও বেশি বোঝে।
তাই দিল্লির প্রতি বাংলাদেশের বার্তা হওয়া উচিত স্পষ্ট, সংযত কিন্তু দৃঢ়—আমরা বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু অবজ্ঞা নয়; আমরা সহযোগিতা চাই, কিন্তু অসম সম্পর্ক নয়; আমরা সুসম্পর্ক চাই, কিন্তু জাতীয় মর্যাদার বিনিময়ে নয়।
কারণ কূটনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা কখনো উচ্চকণ্ঠের হুমকি নয়, বরং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন একটি জাতির দৃঢ় অবস্থান। আর আজ সেই অবস্থান থেকেই বলতে হয়—বাংলাদেশের প্রতি দিল্লির এই অবজ্ঞার কড়া, সুস্পষ্ট এবং মর্যাদাপূর্ণ জবাব চাই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন