যুক্তরাজ্যে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরার মাস চারেক আগে দেশটিতে অবস্থানরত বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের লোকাল বাসে চড়ার কিছু ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ছবিগুলোতে দেখা গিয়েছিল- জনসাধারণের জন্য নির্ধারিত লাল বেঞ্চে তিনি বসে আছেন। হাতে মোবাইল, পরনে হালকা নীল শার্ট, খাকি রঙের প্যান্ট, আর পায়ে সাধারণ একজোড়া স্নিকার্স। কিছুক্ষণ পরেই এসে থামে একটি লাল ডাবল-ডেকার বাস। মানুষজনের সঙ্গে তিনি ওঠে পড়েন সেই বাসে। যেখানে কোনো নিরাপত্তারক্ষী, ঝলমলে প্রটোকল বা গাড়ির বহরের বালাই নেই। একেবারেই সাদামাটা সাধারণ জীবনযাপন তার। একজন সাধারণ নাগরিকের যাপিত জীবনে অভ্যস্ত তারেক রহমানের এমন ছবি তখনই ভিআইপি নামের অভিজাততন্ত্রের রাজনীতির বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছিলেন অনেকেই।
যে মানুষটি প্রবাসে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চলাচল করেছেন, তিনি দেশে ফেরার পর কী বদলে যাবেন? ক্ষমতাসীন হয়ে অভিজাত রাজনীতির ক্লাবেই কী দেখা যাবে তাকে? নিজের কর্মগুণে আলো ছড়িয়ে নিঃশব্দেই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, নৈতিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার নতুন ধারার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেও জনতারই অংশ; সাধারণের কাতারেই তার অবস্থান। ভিআইপি প্রটোকলের কড়াকড়ি বা বাগাড়ম্বর নেই প্রধানমন্ত্রীর। রাজকীয় প্রটোকলের পরিবর্তে সাধারণ নাগরিকের মতোই চলাচল করছেন নিত্য। ট্রাফিক সিগন্যালে বসে থাকছেন। হর্ন বা সাইরেনের চাপ নেই। সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন না। বিলাসবহুল বাহনের প্রথাও যেন বিলুপ্ত করেছেন। কখনও কখনও নিজেই গাড়ি চালিয়ে অংশ নিচ্ছেন সরকারি কর্মসূচিতে। সবশেষ কক্সবাজার সফরেও ১৯৭ কিলোমিটার পথও একাই গাড়ি চালিয়েছেন। সড়কের দু’পাশে ভিড় জমানো দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অভিবাদনের জবাব দিয়েছেন।
একজন নিখাদ রাজনীতিবিদের অন্যতম বড় গুণ বাস্তববাদী মানসিকতা, প্যাশন বা গভীর আবেগ, দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা ও অনুপাত-সম্পর্কিত জ্ঞান। যিনি আপন ক্যারিশমার জোরে সাধারণ মানুষকে নিজের দিকে টানতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের ব্যাগ নিজেই কাঁধে বহন করেন। সিলেট, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় সফরে বিমানে ওঠা বা নামার সময় এমন দৃশ্যের দেখা মিলেছে বহুবার। ইচ্ছে করলেই অন্য কারও স্কন্ধে তাঁর ব্যাগটি ঠাঁই পেতে পারতো। কিন্তু তিনি নিজের কাজ নিজেই করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই দৃষ্টান্তই রেখেছেন বারবার।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সাদামাটা সাদা শার্ট, রিমলেস চশমা, ধূসর রঙের প্যান্ট, কালো জুতো আর হাতে মেটাল চেইনের ঘড়িতে স্টাইলিশ একজন প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছে দেশ। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাদা পোশাক একজন নেতার ভেতরে স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা ও সংযমের অনুভূতি তৈরি করে। তাঁর পোশাকে, ব্যক্তিত্বে বিনয়-নম্রতা তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বদানের দর্শনকেও মোটা দাগে সামনে এনেছে। যেখানে রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে জনগণের কোন দূরত্ব নেই। চিরায়ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের বার্তা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন নেতৃত্ব জনগণের উর্ধ্বে নয় বরং দায়বদ্ধ। নিজের ক্ষেত্রেও তিনি কখনও নৈতিকতার মানদণ্ড শিথিল করেননি। সংযত ও মার্জিত তাঁর রাজনীতির ভাষাও। বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক ম্যাক্স ওয়েবার একবার বলেছিলেন, 'যেকোনো একটি সংকট-পরবর্তী সময়ে ক্যারিশম্যাটিক চারিত্রিক গুণাবলি নিয়ে যিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসবেন, তিনি দেশের মানুষের আস্থা এবং জনপ্রিয়তা অর্জনে অধিক কার্যকর হবেন।' সত্যিই ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে গণপরিসরে তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তায় চালকের আসনে রয়েছেন তারেক রহমান।
ক্ষমতায় থাকলে সাধারণত সরকার ও দলের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক বা বাস্তবিক দূরত্ব-শূন্যতা তৈরি হয়। অথচ দীর্ঘ সংগ্রামের পথে ত্যাগের অনেক উদাহরণ তৈরি করেন দলের নেতাকর্মীরাই। এই অধ্যায়েও ক্ষমতার চেয়ারে বসে নিজের আচরণ বা প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়ার চিরন্তন রাজনৈতিক সংকটের ধারাও ভেঙেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। দলের তৃণমূলের একজন কর্মীর কাছে তিনি শ্রদ্ধা-আবেগের ‘ভাইয়া’। ক্ষমতার অহংকারজনিত কোন সমস্যা নেই বলেই কীনা সম্প্রতি ময়মনসিংহের ত্রিশালে নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে তিনি যাওয়ার পথে সড়ক পথে তাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষমান হাজার হাজার নেতাকর্মীর মধ্যে সামনে এগিয়ে আসা ময়মনসিংহ মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি নাইমুল করিম লুইনকে লাল-সবুজের বুলেটপ্রুফ বাসে ডেকে তুলে নিয়ে পাশের সিটে বসাতে পারেন। সরকারপ্রধান হয়েও দলের সাধারণ একজন কর্মী থেকেও যে তিনি বিচ্ছিন্ন নন, তাদের শ্রম-ঘাম-ত্যাগের মূল্যায়ন তিনি করতে পারেন এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর কী-বা হতে পারে? যা সহজেই মাঠের একজন কর্মীর সামনের দিনগুলোতে রাজনীতির আলোকময় সম্ভাবনা জাগানিয়া বা ভবিষ্যৎ আন্দোলন-সংগ্রামে লড়াকু মুখের প্রতিচ্ছবি হতে বড় দাওয়াই হতে পারে। কেবল দলের সাধারণ কর্মীই নয়, কোন না কোন সমাবেশ মঞ্চে একজন সাধারণ কৃষককে পাশে বসিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে সুখ-দু:খের কথা শোনছেন প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ মানুষকে সম্মানিত করার মধ্যে দিয়ে তাদের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যাচ্ছেন। রাজনীতিতে এমনটি কী আগে কখনও দেখেছে বাংলাদেশ?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাদাসিধে জীবন যাপন মুগ্ধ করেছে দেশের মানুষকে। তাঁর জামানায় ভিভিআইপি সড়কে চললেও নির্দিষ্ট সড়কের এক পাশ ফাঁকা রেখে আর বন্ধ হচ্ছে না সাধারণ যান চলাচল। জনদুর্ভোগ এড়াতেই তিনি এই সংস্কৃতির লাগাম টেনে ধরেছেন। আইন-রীতিকে পাশ কাটিয়ে
মন্ত্রী-এমপিসহ অন্যদের জন্যই ক্ষমতার প্রদর্শনীর পথও বন্ধ করেছেন। রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে শ্রেণিবৈষম্য অবসান করতে 'সব মানুষ গুরুত্বপূর্ণ' এই নীতি সামনে নিয়ে এসেছেন। সাধারণ একজন হিসেবেই জনগণের বিরক্তির উদ্রেক করতে চান না। প্রধানমন্ত্রীর অফিসেও খাবারের বাজেট কমিয়েছেন অন্তত পাঁচগুণ। সাশ্রয়ী নীতি অনুসরণ করে মাত্র ১৫০ টাকায় সারছেন দুপুরের খাবার ও বিকেলের নাশতা। এসব বিষয়কে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর ন্যায়পরায়ণতার আদর্শের প্রতিফলনের অঙ্গীকার হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন সরকারপ্রধান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে পরিচালিত হচ্ছে সরকার। ১৮০ দিনের কর্মসূচির আলোকে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকার পরিচালনার প্রথম ১১৯ দিনেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনে অমিত দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। কৃষিঋণ মওকুফ, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্ড, প্রবাসী কার্ড, ইমাম ভাতা, খেলোয়াড় ভাতাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন সহায়তার মাধ্যমে জনবান্ধব একগুচ্ছ কর্মসূচিকে দৃশ্যমান করেছেন। ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মধ্যেও একাধিক নীতিগত ও জনমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। একটি সক্রিয়, দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী এবং জনমুখী প্রশাসনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাঁচ দশক আগে বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শুরু করা খাল খনন কর্মসূচিকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খাল খননের সূচনা করেছেন। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল, নদী, নাল, জলাধার খনন করতে চায় তাঁর সরকার। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজও শুরু করে দিয়েছেন। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছেন। তিস্তা প্রকল্প নিয়েও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ১০০ দিনেই মন্ত্রিসভায় নেওয়া ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ৬২ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে।
সুশাসনের মূল হাতিয়ার আইনের শাসনও নিশ্চিত করেছেন। পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র ১৯ দিনে রায় ঘোষণা হয়েছে। ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এক মাসের মধ্যে বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হবে। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই কাঙ্ক্ষিত রায় পেয়েছে শিশুটির পরিবার।
২০ কোটি মানুষের অংশীদারত্বে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেন সরকারপ্রধান তারেক রহমান। ইতোমধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকার পুরোদমে কাজ করছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী 'থ্রি-আর' (রিকভারি, রেসকিউ ও রিবিল্ড) কৌশলের কথা বলেছেন। সেজন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, ডিরেগুলেশন বা বিনিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছেন।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। বাজেটে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘জনমুখী সমৃদ্ধি’ ও ‘গ্রামীণ অর্থনীতি’ চাঙ্গা করার সুস্পষ্ট রূপরেখা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের চোখে ‘এই বাজেটে সরকারের আন্তরিকতা ও অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার দৃঢ় সংকল্পের প্রতিফলন ঘটেছে।’
ব্যবসায়ী নেতারাও বলেছেন, এই বাজেট বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।’ কক্সবাজারের জনসভায় সরকারের বাজেট নিয়ে সবচেয়ে বড় সফলতার একটি প্রমাণ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘খবরের কাগজগুলোয় দেখলাম, এবারের বাজেটের পরে এখন পর্যন্ত কোনো জিনিসের দাম বাড়েনি। কারণ, চাল, ডাল, তেল, নুনসহ সকল প্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর যে ট্যাক্স ছিল, বর্তমান সরকার ৬০টি পণ্যের ওপর থেকে তা তুলে নিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই, দেশের মানুষ যাতে ভালো থাকতে পারে।’
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন