× UCB Sticker Card
শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম

মতামত

সীমান্ত হত্যা ও অবৈধ পুশ-ইনের চেষ্টা বন্ধ করা উচিত

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৮:৫০ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে প্রায়ই ‘বন্ধুত্বের মডেল’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। কিন্তু এই সম্পর্কের ওপর দীর্ঘদিন ধরে একটি অন্ধকার ছায়া হয়ে আছে সীমান্ত হত্যা এবং সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে ওঠা অবৈধ পুশ-ইনের অভিযোগ। প্রশ্ন হলো, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অসংখ্য বৈঠক, যৌথ ঘোষণা এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পরও কেন সীমান্তে রক্ত ঝরছে? কেন এখনো নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যু ঘটছে? কেন দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল উপেক্ষা করে মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে?

সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি ও বিএসএফের ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং অবৈধ পুশ-ইন বন্ধে উভয় পক্ষ অঙ্গীকার করেছে। এটি ইতিবাচক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ বহু বছর ধরে একই ধরনের প্রতিশ্রুতি শুনে আসছে। এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফলাফল দেখতে চায় বাংলাদেশের মানুষ।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত। প্রায় ৪,১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তে লাখো মানুষের বসবাস। কৃষি, ক্ষুদ্র বাণিজ্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন এই সীমান্তকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দীর্ঘ সীমান্তের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানির হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি।

মানবাধিকার সংস্থা ওধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মাত্র নয় বছরে বিএসএফের হাতে ৪০৩ জন বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে ২৬৯ জন গুলিতে এবং ১০৯ জন নির্যাতনের মাধ্যমে নিহত হন। একই সময়ে শত শত মানুষ আহত ও আটক হওয়ার অভিযোগও উঠে।

অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন HRSS-এর তথ্য বলছে, গত এক দশকে অন্তত ৩০৫ জন বাংলাদেশি সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছেন এবং আরও ২৮২ জন আহত হয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই ২৬ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ২৫ জন আহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

এসব সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প। কুড়িগ্রামের কিশোরী ফেলানী খাতুনের নাম আজও বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে অম্লান। ২০১১ সালে বিএসএফের গুলিতে নিহত হওয়ার পর তার মরদেহ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকার দৃশ্য বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর ভারত সরকার সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারে সংযমের আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কি অবৈধ অনুপ্রবেশ বা চোরাচালান ঠেকাতে গুলি করাকেই প্রথম পন্থা হিসেবে গ্রহণ করতে পারে?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন স্পষ্টভাবে বলে যে, প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার হবে একান্ত শেষ বিকল্প এবং কেবল তখনই যখন কারও জীবন তাৎক্ষণিকভাবে হুমকির মুখে পড়ে। জাতিসংঘের "Basic Principles on the Use of Force and Firearms by Law Enforcement Officials" অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বনিম্ন প্রয়োজনীয় শক্তি ব্যবহার করতে হবে। সন্দেহভাজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে, বিচার করা যেতে পারে, কিন্তু বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। ২০১০ সালে প্রকাশিত "Trigger Happy" শীর্ষক প্রতিবেদনে Human Rights Watch বিএসএফের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরে। সংস্থাটি পরবর্তীতেও একাধিকবার ভারত সরকারকে সীমান্ত হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের ভেতরেও বহু মানবাধিকার কর্মী ও সংগঠন সীমান্তে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সমালোচনা করেছে। কারণ এটি কেবল বাংলাদেশিদের সমস্যা নয়; এটি আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত হত্যা ইস্যুর পাশাপাশি নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে অবৈধ পুশ-ইন। বাংলাদেশ অভিযোগ করছে, যথাযথ যাচাই-বাছাই ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কিছু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিজিবি ইতোমধ্যে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে। সাম্প্রতিক বৈঠকেও এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশে ফেরত পাঠানোর একটি স্বীকৃত পদ্ধতি রয়েছে। জাতীয়তা যাচাই, কনস্যুলার যোগাযোগ, দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা এবং আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক রীতি ও রাষ্ট্রসার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হন, বাংলাদেশ তাকে গ্রহণ করবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হতে হবে, জোরপূর্বক পুশ-ইনের মাধ্যমে নয়।

বিশ্বের অন্যান্য সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালেও দেখা যায়, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আরও অনেক কার্যকর পদ্ধতি রয়েছে। উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ কিংবা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও সীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তি, নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য এবং আইনি ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রাণঘাতী গুলি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিক্রিয়া হতে পারে না।

বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রেও আরও সক্রিয় হতে হবে। প্রতিটি সীমান্ত হত্যার আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করা, দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরামে বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা জরুরি। 

একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈধ বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতেরও উপলব্ধি করা উচিত, শক্তি প্রদর্শন কখনো দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করতে পারে না। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের ওপর একটি অতিরিক্ত নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে পরিচালিত হওয়াই একজন দায়িত্বশীল আঞ্চলিক শক্তির বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, কোনো সম্পর্কই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় নয়। সীমান্তে আর একটি ফেলানী, আর একটি নিরস্ত্র কৃষক, আর একটি তরুণের মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একইভাবে কোনো রাষ্ট্রের ওপর জোরপূর্বক মানুষের বোঝা চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

পরিশেষে বলা যায়,নয়াদিল্লির সাম্প্রতিক সম্মেলন আবারও আশা জাগিয়েছে যে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এবং পুশ-ইন বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এখন আর কূটনৈতিক ভাষার প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা দেখতে চায় বাস্তব পরিবর্তন, দৃশ্যমান জবাবদিহিতা এবং মানবিক আচরণ।

কারণ একটি সভ্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সীমান্ত নিরাপদ হতে পারে, কিন্তু তা কখনো মানুষের রক্তের বিনিময়ে নয়। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু তা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের মূল্যবোধ বিসর্জন দিয়ে নয়। তাই সীমান্ত হত্যা ও অবৈধ পুশ-ইন বন্ধে আর প্রতিশ্রুতি নয়—বাংলাদেশের মানুষ বাস্তবায়ন দেখতে চাই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

Link copied!