কোনো রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে বিচার করা যায় না; এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় নাগরিকদের জীবনমানের মাধ্যমে। আর সেই মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো স্বাস্থ্যসেবা। অর্থনীতি যতই বড় হোক, অবকাঠামো যতই বিস্তৃত হোক, যদি সাধারণ মানুষ অসুস্থতার সময় চিকিৎসা না পায়, হাসপাতালের বারান্দায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় কিংবা একটি আইসিইউ বেডের জন্য দীর্ঘ সময় ছুটে বেড়াতে হয়, তবে সেই উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা এমনই ছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য এক নীরব দুর্ভোগে পরিণত হয়েছিল। এই বাস্তবতার মধ্যেই সরকারের সাম্প্রতিক স্বাস্থ্য উদ্যোগ নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। দেশের ৪৯২টি উপজেলার ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় অবকাঠামোগত রূপান্তর কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
শুধু শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, প্রতিটি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা, জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং বিশেষায়িত সেবার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্বাস্থ্যসেবাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কেন্দ্রিকরণ। দেশের অধিকাংশ উন্নত চিকিৎসাসেবা ঢাকা কিংবা বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক। ফলে একজন গ্রামের মানুষ গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে শত শত কিলোমিটার দূরে রাজধানী কিংবা বড় শহরে ছুটতে হয়। এতে যেমন রোগীর ভোগান্তি বাড়ে, তেমনি বড় হাসপাতালগুলোতেও সৃষ্টি হয় অস্বাভাবিক চাপ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কিংবা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করিডোরে প্রতিদিন যে রোগীর ঢল দেখা যায়, তা মূলত এই বৈষম্যমূলক স্বাস্থ্য কাঠামোরই প্রতিফলন।
একজন কৃষক, দিনমজুর কিংবা নিম্ন আয়ের পরিবারের সদস্য যখন একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হন, তখন চিকিৎসার চেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় চিকিৎসার জন্য যাতায়াত, আবাসন ও অন্যান্য খরচ। অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে কিংবা গবাদিপশু বিক্রি করে চিকিৎসার ব্যয় মেটায়। ফলে অসুস্থতা শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, অর্থনৈতিক বিপর্যয়েরও কারণ হয়ে ওঠে। উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এই দীর্ঘদিনের সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।
সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনায় প্রতিটি উন্নীত হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা রাখা হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা ছিল আইসিইউ সংকট। করোনা মহামারির সময় পুরো দেশ দেখেছে কীভাবে একটি আইসিইউ বেডের জন্য অসংখ্য মানুষ অসহায়ভাবে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেছেন।
রাজধানীর বাইরের অধিকাংশ হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা না থাকায় অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা পাননি। উপজেলা পর্যায়ে আইসিইউ সুবিধা চালু হলে জরুরি ও সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের ঘোষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—গ্রামীণ চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে প্রতিটি হাসপাতালে নারী ও পুরুষ ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ফিজিওথেরাপি এখনো অবহেলিত একটি ক্ষেত্র। অথচ স্ট্রোক, দুর্ঘটনা, পক্ষাঘাত, বার্ধক্যজনিত সমস্যা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ব্যথায় আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব অপরিসীম। উপজেলা পর্যায়ে এই সেবা চালু হলে লাখো মানুষ উপকৃত হবেন।
স্বাস্থ্যসেবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশু চিকিৎসা। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ বিকাশের ওপর। সরকার পাঁচটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার শিশু বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশের শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিশেষায়িত শিশু হাসপাতালগুলো চালু হলে জটিল রোগে আক্রান্ত শিশুদের উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
একইভাবে নারীস্বাস্থ্য খাতেও বড় উদ্যোগের ঘোষণা এসেছে। চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগে পাঁচটি বড় শহরে এক হাজার শয্যার আধুনিক নারী হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়; এটি নারীদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীরা এখনো মাতৃস্বাস্থ্য, স্ত্রীরোগ চিকিৎসা ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। আধুনিক নারী হাসপাতালগুলো এই ব্যবধান কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা শয্যা বৃদ্ধি দিয়ে নিশ্চিত হয় না। একটি হাসপাতাল তখনই কার্যকর হয়, যখন সেখানে দক্ষ চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, ওষুধ, যন্ত্রপাতি এবং সুশাসন নিশ্চিত থাকে।
অতীতে আমরা বহুবার দেখেছি, নতুন ভবন নির্মাণ হয়েছে কিন্তু জনবল নিয়োগ হয়নি; আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে কিন্তু সেগুলো চালানোর প্রশিক্ষিত কর্মী নেই; হাসপাতাল নির্মাণ হয়েছে কিন্তু পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নেই। ফলে অবকাঠামো থাকলেও সেবার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জনবল ও যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারকে সফল করতে হলে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু হাসপাতালের বেড বাড়ালেই হবে না; সেই বেডে রোগীকে সেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীও নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে দুর্নীতির প্রসঙ্গটিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাত নানা ধরনের অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় থেকে শুরু করে নিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা ওষুধ সরবরাহ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব জনআস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ার অঙ্গীকার শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি সময়ের দাবি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকদের আবাসন সংকটের বিষয়টিও দীর্ঘদিনের সমস্যা। দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও সেখানে শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকদের বসবাসের পরিবেশ বহু বছর ধরে সমালোচিত। প্রায় ১১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ চিকিৎসা শিক্ষা ও চিকিৎসক কল্যাণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কারণ একজন চিকিৎসক যদি মানবিক পরিবেশে বসবাস ও কাজ করার সুযোগ না পান, তাহলে তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ মানের সেবা প্রত্যাশা করাও কঠিন।
তবে সবকিছুর পরও এই উদ্যোগগুলোর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ঘোষণার পর বাস্তবায়ন পর্যায়ে নানা জটিলতা দেখা গেছে। সময়ক্ষেপণ, ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের কাজ এবং প্রশাসনিক জটিলতা অনেক ভালো উদ্যোগকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তাই এই স্বাস্থ্য সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নির্ধারিত সময়ে এবং নির্ধারিত মান বজায় রেখে প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করা।
বাংলাদেশ এখন একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অসংক্রামক রোগের বিস্তার, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি আগামী দিনে স্বাস্থ্য খাতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। এই চাপ মোকাবিলায় শক্তিশালী উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্য খাতের এই বৃহৎ উদ্যোগকে তাই কেবল একটি সরকারি প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আসলে রাষ্ট্রের সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। একজন নাগরিক যখন জানবেন যে তার নিজ উপজেলা হাসপাতালেই আইসিইউ সুবিধা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং আধুনিক চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাবে, তখন তার রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়বে। স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত গণতন্ত্রীকরণ তখনই সম্ভব হবে, যখন চিকিৎসার জন্য রাজধানীমুখী হওয়া বাধ্যতামূলক থাকবে না।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত বহুদিন ধরেই অবহেলা, সংকট ও সীমাবদ্ধতার গল্প বহন করে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলো যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেই গল্প বদলাতে শুরু করতে পারে। উপজেলা হাসপাতালগুলোর সম্প্রসারণ, শিশু ও নারী বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, আইসিইউ সুবিধার বিস্তার, জনবল বৃদ্ধি এবং দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা মিলিয়ে এটি একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রের প্রকৃত সম্পদ হলো তার মানুষ। আর মানুষের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হলে উন্নয়নের অর্জন বাস্তব অর্থে পরিপূর্ণতা লাভ করে। সেই প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যখাতে সরকারের এই বৃহৎ উদ্যোগ শুধু অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ, যার ইতিবাচক প্রভাব আগামী প্রজন্মের জীবনমানকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
লেখক : আহসান হাবিব বরুন
সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।


সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন