× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

প্রিন্সিপাল নুরে আলম তালুকদার

প্রকাশিত: জুন ২, ২০২৬, ০১:৪১ এএম

কেন প্রয়োজন একটি স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন

প্রিন্সিপাল নুরে আলম তালুকদার

প্রকাশিত: জুন ২, ২০২৬, ০১:৪১ এএম

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

ছবি : রূপালী বাংলাদেশ

শিক্ষা একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক পরিবর্তন এবং নৈতিক উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যত উন্নত, সে দেশ তত উন্নত। শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, জাতীয় উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য। অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শিক্ষা একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান উপাদান। Human Capital Theory অনুযায়ী, শিক্ষা মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করে, উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়। শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটে, গবেষণা বৃদ্ধি পায়, দারিদ্র্য কমে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। তাই শিক্ষা উন্নয়ন মানেই জাতীয় উন্নয়ন।

বাংলাদেশে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার মান, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা প্রমাণ করে শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সমন্বয় নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। শিক্ষার মানের অবনতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিংনির্ভরতা, বেকারত্ব বৃদ্ধি এবং দক্ষতার অভাব—এসব সমস্যা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এই পরিস্থিতিতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর জন্য একটি শক্তিশালী ও যুগোপযোগী শিক্ষা কমিশন গঠন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কারের জন্য একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন অত্যন্ত প্রয়োজন। এই কমিশন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি করবে।

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গবেষণা ও দক্ষতায় এগিয়ে নিতে হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনই পরিবর্তন আনতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হবে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। অতএব, যত দ্রুত সম্ভব একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও যুগোপযোগী ‘স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন’ গঠন করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কয়েকটি স্তরে বিভক্ত। এগুলো হলো—প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং মাদ্রাসা শিক্ষা।

আন্তর্জাতিক সংস্থা UNESCO, UNICEF এবং World Bank-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে গেলেও মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্য।

শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান ব্যর্থতাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এর ফলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণক্ষমতা বিকশিত হচ্ছে না, যার প্রভাব পরবর্তী জীবনে পড়ছে। Bangladesh Bureau of Statistics-এর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্বের হার বেশি। এর অন্যতম কারণ শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষতাভিত্তিক নয়।

শিক্ষার মানের অবনতির প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—অপ্রশিক্ষিত শিক্ষক, পুরোনো পাঠ্যক্রম, গবেষণার অভাব, বড় ক্লাস, দুর্বল মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং কোচিংনির্ভর শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষাকে ব্যাহত করছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা কার্যক্রম সীমিত। এছাড়া শিক্ষায় নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চাও পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না।

তাই শিক্ষা কারিকুলামে প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আলাদা বিষয় হিসেবে ‘নৈতিক শিক্ষা’ (Moral Education) অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। কথায় আছে, “কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাশঠাশ।” তাই খুব ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।

অপরদিকে, বাজেট বিশ্লেষণেও দেখা যায় যে, বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব, শিক্ষা নীতির সঠিক বাস্তবায়নের ঘাটতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব, গবেষণার সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতি কাঠামোগতভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে। এর ফলে শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট হয়েছে।

উন্নত দেশগুলো যেমন ফিনল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা নেই। এসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা গবেষণা, দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর। পাশাপাশি রয়েছে উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা খাতে উচ্চ বাজেট বরাদ্দ। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

উপরোক্ত কারণগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাগুলো এত ব্যাপক যে ছোটখাটো সংস্কার দিয়ে এগুলোর সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন প্রয়োজন, যার কাঠামো গঠিত হবে শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা, শিক্ষা উদ্যোক্তা, সমাজবিজ্ঞানী এবং শিক্ষা প্রশাসকদের সমন্বয়ে।

নবগঠিত শিক্ষা কমিশনের কাজ হবে—

শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা বিশ্লেষণ; দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন; পাঠ্যক্রম সংস্কার; শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সমন্বয়; গবেষণা উন্নয়ন; শিক্ষা নীতির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ।

শিক্ষা সংস্কারের নীতিমালা ও সুপারিশ

আমার গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে শিক্ষা কমিশনের যেসব কাজ করা প্রয়োজন—

১. দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম চালু।
২. পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ (আইটি শিক্ষা, গবেষণা শিক্ষা ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিক্ষা)।
৩. কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ।
৪. উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ।
৫. শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি।
৬. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি।
৭. বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদ্রাসা শিক্ষার মধ্যে সমন্বয়সহ একটি একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

বাস্তবায়ন পরিকল্পনা

১. শিক্ষা সংস্কার আইন প্রণয়ন।
২. নতুন পাঠ্যক্রম চালু।
৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
৪. কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ।
৫. গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি।
৬. শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
৭. শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি।

উপসংহার

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটের মধ্যে রয়েছে। শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু শিক্ষার মান উন্নত হয়নি। শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না এবং গবেষণা কার্যক্রম সীমিত—এই পরিস্থিতি দেশের উন্নয়নের জন্য একটি বড় বাধা।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি শক্তিশালী, স্বাধীন এবং বিশেষজ্ঞভিত্তিক ‘স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। একটি কার্যকর শিক্ষা কমিশনই পারে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক, দক্ষতাভিত্তিক এবং যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে। একই সঙ্গে একটি দক্ষ, শিক্ষিত, নৈতিক ও উন্নত জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রেফারেন্স

১. UNESCO – Global Education Report
২. UNICEF – Bangladesh Education Report
৩. World Bank – Education Sector Review
৪. Bangladesh Bureau of Statistics – Labour Force Survey
৫. BANBEIS – Education Statistics Report

লেখক:
প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক,
বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্ট এবং পরিচালক, পরিচালনা পর্ষদ,
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক।

Link copied!