× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: মে ৩০, ২০২৬, ১০:২৭ পিএম

জাতিসংঘের প্রশংসা: শান্তির নীল হেলমেটে বাংলাদেশের গৌরব

আহসান হাবিব বরুন

প্রকাশিত: মে ৩০, ২০২৬, ১০:২৭ পিএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

বিশ্ব যখন যুদ্ধ, সংঘাত, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক বিপর্যয়ের ভারে ন্যুব্জ, তখন কিছু মানুষ নিজেদের জীবন বাজি রেখে শান্তির পতাকা বহন করেন। তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে যান না; বরং যুদ্ধ থামাতে যান। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানবতার আলো জ্বালাতে যান। জাতিসংঘের নীল হেলমেট পরিহিত সেই সাহসী শান্তিরক্ষীদের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিনিধি আজ বাংলাদেশ। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা শুধু দায়িত্বই পালন করছেন না, তারা গড়ে তুলেছেন পেশাদারিত্ব, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে এবারও বিশ্বব্যাপী দায়িত্ব পালনরত ৫০ হাজারেরও বেশি শান্তিরক্ষীকে সম্মান জানিয়েছে জাতিসংঘ। তাদের মধ্যে রয়েছেন চার হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী। বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির, ঝুঁকিপূর্ণ ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করে তারা শুধু বাংলাদেশের পতাকাকেই উঁচু করছেন না, বরং বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদাকেও অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব এন্থিনিও গুতেরেস যথার্থই বলেছেন, শান্তিরক্ষীরা বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছেন, ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন, নির্বাচন আয়োজনের সহায়তা করছেন এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ সুগম করছেন। এটি কেবল সামরিক দায়িত্ব নয়; এটি মানবতার সেবা। আর এই মানবিক দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা আজ বিশ্বের কাছে এক বিশ্বাসযোগ্য নাম।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা অভিযানে অংশগ্রহণের ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে উঠে এসে বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং জনগণের দেশপ্রেমের প্রতিফলন।

বিশ্বের নানা প্রান্তে—আফ্রিকার কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, মালি কিংবা লেবাননের মতো অস্থির অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালন করেছেন অসীম সাহস ও দক্ষতার সঙ্গে। তারা কখনো সশস্ত্র সংঘর্ষ থামিয়েছেন, কখনো অনাহারী মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছে দিয়েছেন, কখনো আহত শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন, আবার কখনো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে স্কুল নির্মাণ করে মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়েছেন। ফলে শান্তিরক্ষী হিসেবে বাংলাদেশি সেনাদের পরিচয় কেবল সৈনিক নয়, বরং মানবতার দূত হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তার সামরিক দক্ষতা নয়; বরং তার শৃঙ্খলা, সহনশীলতা, মানবিক আচরণ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা। আফ্রিকার বহু অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের স্থানীয়রা “বন্ধু সেনা” হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ তারা শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন না, মানুষের পাশে দাঁড়ান। এই মানবিক আচরণই বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অন্যদের থেকে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের এই সুনামের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, পেশাগত নিষ্ঠা এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ মানসিকতা।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করা সহজ কাজ নয়। প্রতিনিয়ত সেখানে জীবনহানির ঝুঁকি থাকে। কখনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলা, কখনো সন্ত্রাসী আক্রমণ, কখনো মহামারি বা দুর্ভিক্ষ—সব ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের দৃঢ় মনোবল দিয়ে বিশ্বকে বারবার মুগ্ধ করেছেন।

১৯৪৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার শান্তিরক্ষী। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশেরও অনেক সাহসী সেনাসদস্য। তারা দেশের মাটিতে নয়, কিন্তু মানবতার জন্য জীবন দিয়েছেন। তাই তাদের আত্মত্যাগ কেবল বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বের শান্তির ইতিহাসের অংশ। একজন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর শাহাদাত মানে কেবল একটি পরিবারের শোক নয়; এটি একটি জাতির গর্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতীক।

আজকের বিশ্বে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আগের চেয়ে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। শুধু অস্ত্রবিরতি পর্যবেক্ষণ নয়, এখন শান্তিরক্ষীদের কাজের মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার রক্ষা, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্বাচন সহায়তা, জলবায়ুজনিত সংকট মোকাবিলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। এই বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বিশেষ করে নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করেছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—“শান্তিতে বিনিয়োগ”। এই প্রতিপাদ্যের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। কারণ যুদ্ধের পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার সামান্য অংশও যদি শান্তি প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে পৃথিবী আরও নিরাপদ ও মানবিক হতে পারত। শান্তিরক্ষীরা সেই বার্তাই বহন করছেন। আর বাংলাদেশ সেই বৈশ্বিক উদ্যোগের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার।

বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা দিন দিন বাড়ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা বারবার বাংলাদেশি বাহিনীর প্রশংসা করেছেন। কারণ তারা শুধু নির্দেশ পালন করেন না; তারা পরিস্থিতি বুঝে মানবিক সমাধান খুঁজে বের করেন। তাদের আচরণে থাকে পেশাদারিত্ব, আবার হৃদয়ে থাকে মানবতার স্পর্শ।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই সুনাম দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস। আজকের যুবসমাজ যখন সামাজিক অস্থিরতা, বিভ্রান্তি ও হতাশার মধ্যে পথ খুঁজছে, তখন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধ তাদের সামনে এক উজ্জ্বল আদর্শ হয়ে উঠতে পারে। দেশপ্রেম মানে শুধু আবেগ নয়; বরং দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবকল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা—এ শিক্ষা আমাদের শান্তিরক্ষীরা প্রতিনিয়ত দিয়ে চলেছেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও শান্তিরক্ষা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় শান্তিরক্ষা মিশনে। যুদ্ধ নয়, শান্তি; প্রতিশোধ নয়, সহমর্মিতা—বাংলাদেশ বিশ্বের সামনে এই বার্তাই তুলে ধরছে। ফলে শান্তিরক্ষা কার্যক্রম কেবল সামরিক অবদান নয়; এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদারও প্রতীক।

তবে এই গৌরব ধরে রাখতে হলে শান্তিরক্ষীদের আরও আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, জলবায়ু সংঘাত এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় শান্তিরক্ষীদের আরও দক্ষ হতে হবে। বাংলাদেশকে সেই প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।

একই সঙ্গে শান্তিরক্ষীদের পরিবারগুলোর প্রতিও রাষ্ট্র ও সমাজের আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কারণ একজন শান্তিরক্ষী যখন দূর দেশে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তার পরিবারও মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে। যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের পরিবারকে যথাযথ সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়া একটি সভ্য রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, “শান্তিতে বিনিয়োগ মানে নিরাপদ ভবিষ্যতে বিনিয়োগ।” এই কথার গভীর সত্যতা আজ বিশ্বের প্রতিটি সংঘাতময় অঞ্চলে প্রতিফলিত হচ্ছে। আর সেই শান্তির ভবিষ্যৎ নির্মাণে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা এক অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। তাদের সাহস, আত্মত্যাগ ও মানবিকতা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাকে বিশ্বের বুকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

পরিশেষে বলা যায়,আজ যখন কোনো দূরবর্তী আফ্রিকান গ্রামে একটি শিশু নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে, যখন কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে, যখন কোনো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তির আলো জ্বলে ওঠে—সেখানে হয়তো নীরবে কাজ করছেন একজন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী। তার কাঁধে শুধু একটি অস্ত্র নয়, বহন করছে একটি দেশের মর্যাদা, একটি জাতির মানবিক চেতনা এবং বিশ্বশান্তির প্রতি অঙ্গীকার। এই গৌরব বাংলাদেশের। এই সম্মান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর। এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের মানুষের। আর সেই কারণেই জাতিসংঘের নীল হেলমেট আজ শুধু শান্তির প্রতীক নয়; এটি বাংলাদেশের অকৃত্রিম গৌরব ও অহংকারের প্রতীক।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। 

ই-মেইল: [email protected] 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!