সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের আটতলা বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানের অংশ হিসেবে বাড়িতে থাকা বিভিন্ন মালামাল ও সম্পদের তালিকা (ইনভেন্টরি) তৈরির কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি।
সোমবার (২০ জুলাই) দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল জলসিঁড়ির ওই বাড়িতে পৌঁছে তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে। দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ জানান, আদালতের আদেশ অনুযায়ী সম্পত্তির ইনভেন্টরির কাজ চলছে।
তবে বাড়িটিতে কী ধরনের সম্পদ পাওয়া গেছে বা তালিকা তৈরির কাজ শেষ হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য দেয়নি দুদক।
আদালতের আদেশে জব্দ সম্পত্তির তালিকা
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় আদালতের আদেশে জিয়াউল আহসান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে থাকা ৩৯টি স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা হয়। এসব সম্পত্তির মধ্যে জলসিঁড়ির আটতলা বাড়িটিও রয়েছে।
দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুল ইসলাম আদালতে আবেদন করে জানিয়েছিলেন, জব্দ করা সম্পত্তিগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তত্ত্বাবধায়ক না থাকায় সেগুলো বেহাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ সম্পত্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা ও তদারকির জন্য তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগের আদেশ দেন।
জলসিঁড়ির বাড়িসহ কয়েকটি সম্পত্তির রিসিভার হিসেবে গণপূর্ত বিভাগের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি সম্পত্তির অবস্থান অনুযায়ী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসকদেরও বিভিন্ন সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক করা হয়।
৩৯টি সম্পত্তির মূল্য প্রায় ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকা
আদালতের নথি অনুযায়ী, জব্দ করা সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে ঢাকার দক্ষিণখান, পল্লবী, মিরপুর ডিওএইচএস ও আশুলিয়ার জমি ও ফ্ল্যাট; নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জলসিঁড়ি, কায়েতপাড়া ও নাওড়ার বাড়ি, প্লট ও কৃষিজমি; বরিশাল সদর ও বাকেরগঞ্জের বাড়ি, বাগানবাড়ি ও জমি; ঝালকাঠির বাড়ি, পুকুর ও কৃষিজমি; পটুয়াখালীর কুয়াকাটার জমি এবং মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের কৃষিজমি।
দুদকের নথিতে এসব ৩৯টি স্থাবর সম্পদের মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ১৫ কোটি ৭৭ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৭ টাকা।
জিয়াউল আহসান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
প্রায় ৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ৩৪২ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে ২০২৫ সালের ২৩ জানুয়ারি জিয়াউল আহসান ও তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে দুদক।
এক মামলায় দুদকের অভিযোগ, জিয়াউল আহসান তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২২ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ১৪২ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। এছাড়া অনুমোদিত সীমার বেশি নিজের হিসাবে ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার রাখার অভিযোগও আনা হয়েছে।
দুদকের দাবি, জিয়াউল আহসানের আটটি সক্রিয় ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের সহযোগিতায় এসব অর্থ স্থানান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগও রয়েছে।
অন্যদিকে নুসরাত জাহানের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ৫৯ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তার চারটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক।
অভিযোগের প্রেক্ষাপট
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জিয়াউল আহসান এসব সম্পদ অর্জন করেন। তার সম্পদের মধ্যে পাঁচটি বাড়ি, তিনটি ফ্ল্যাট এবং ৩ হাজার ৩৩৩ দশমিক ৫১ শতাংশ কৃষি ও অকৃষি জমির তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
জিয়াউল আহসান জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এরপর ঢাকার নিউ মার্কেট থানায় করা একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন