মিয়ানমার আন্দামান সাগরে ১০০ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের (টিসিএফ) বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে—এমন খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় জ্বালানি অনুসন্ধানের অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, সমুদ্র তলদেশের ভূ-গঠন বিবেচনায় মিয়ানমারের আবিষ্কৃত গ্যাস কাঠামোর বিস্তৃতি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাতেও থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের অংশে বড় কোনো গ্যাস আবিষ্কারের খবর পাওয়া যায়নি।
প্রায় ২৩ বছর আগে মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি এলাকায় প্রায় ৫ টিসিএফ গ্যাসের মজুত আবিষ্কার করে। পরবর্তীতে দেশটি ওই গ্যাস উত্তোলন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে রপ্তানি শুরু করে। একই অঞ্চলের কাছাকাছি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সেখানে বড় ধরনের অনুসন্ধান কার্যক্রম বা বাণিজ্যিক আবিষ্কার না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার সেন্টমার্টিন সংলগ্ন এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়। এ সময় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান দাইয়ু জাহাজভর্তি সরঞ্জাম নিয়ে এলাকায় পৌঁছালে মিয়ানমারের নৌবাহিনী তাদের বাধা দেয়। মিয়ানমার ওই অঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবি করেছিল। পরে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮২৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এর মধ্যে ওই বিতর্কিত এলাকাটিও বাংলাদেশের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
তবে সমুদ্রসীমা অর্জনের পরও গত এক যুগের বেশি সময়ে বাংলাদেশের অফশোর ব্লকগুলোতে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। সমালোচকদের অভিযোগ, বিশাল সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পরিবর্তে বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে বেশি ঝুঁকেছে। এর ফলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজি ও কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে এবং প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। তাদের দাবি, স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্র এলাকায় নিয়মিত অনুসন্ধান চালানো হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হতে পারত।
এদিকে মিয়ানমারের আবিষ্কৃত গ্যাস বাংলাদেশ হয়ে ভারতে নেওয়ার একটি সম্ভাব্য প্রস্তাব নিয়েও অতীতে আলোচনা হয়েছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ পাইপলাইন ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ‘হুইলিং চার্জ’ পেতে পারত এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক দামে গ্যাস কেনার সুযোগও তৈরি হতে পারত। তবে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ করে বাংলাদেশ ওই উদ্যোগে সম্মতি দেয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার কয়েকটি ব্লকে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসিকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়েও সেখানে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের খবর পাওয়া যায়নি। একই সময়ে ভারতের গোদাবরী বেসিন এলাকায় বড় গ্যাস আবিষ্কার ও উৎপাদন কার্যক্রম চলতে থাকায় বাংলাদেশের সমুদ্র অনুসন্ধানের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রসীমার সম্পদ অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতা দেশের জন্য বড় সুযোগ হারানোর কারণ হতে পারে। গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার অফশোর ব্লকগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এখন দেখার বিষয়, এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় এবং বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যায়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন