সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) জি এম নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বৈবাহিক সম্পর্ক গোপন রেখে দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য চাকরির সুপারিশ করার অভিযোগ উঠেছে। ৭৪ বছর বয়সী এই এমপি গত ১৭ জুন ১৮ বছর বয়সী মরিয়ম বেগমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পাঁচ দিন পর, ২২ জুন, তার জন্য একটি চাকরির আবেদনপত্রে ‘জোর সুপারিশ’ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে, অসম বয়সের এই দম্পতির ব্যক্তিগত সময়ের একটি গোপনে ধারণ করা ভিডিও গত সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক এমপি নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমি এই প্রথম এখানে এসেছি।’
একজন এমপির চাকরির সুপারিশ করাকে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখা হলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে।
প্রথমদিকে জামায়াতের কিছু সমর্থক ভিডিওটিকে ভুয়া বলে দাবি করলেও পরে এমপি নজরুল ইসলাম ভিডিওটি আসল বলে নিশ্চিত করেন। তবে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে জানান, দল বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভিডিও প্রকাশের পর সোমবার রাতে যোগাযোগ করা হলে এমপি নজরুল ইসলাম তাঁর দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামা পাঠান।
কাবিননামা অনুযায়ী, ১৭ জুন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে তিন লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়েটি নিবন্ধিত হয়। স্থানীয় কাজী বদরুল আলম মো. বাকী বিল্লাহ জানান, বর, কনে ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতেই বিয়েটি নিবন্ধন করা হয়েছে।
কাবিননামায় দেখা যায়, এমপির প্রথম স্ত্রী বেগম মাকসুদা ইসলাম বিয়ের সাক্ষী ছিলেন। কনের পক্ষে উকিল হন তার বাবা মাসুম বিল্লাহ। কাবিননামায় কনের বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ১৮ বছর ১ মাস। সে হিসাবে মরিয়ম বেগমের চেয়ে নজরুল ইসলাম ৫৭ বছরের বড়।
এমপির প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় বলেন, তাঁর অনুমতিতেই নজরুল ইসলাম দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। স্বামীর বিরুদ্ধে ছড়ানো ‘কুৎসা’র বিরুদ্ধে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।
মরিয়ম বেগমের বাবা ভিডিওবার্তায় দাবি করেন, তার মেয়ে মরিয়মের মামা এবং তাঁর শ্যালক ওবায়দুল্লাহ গোপনে ভিডিও ধারণ করেন। পরে এমপির কাছ থেকে টাকা আদায়ের উদ্দেশ্যে ভিডিওটি ফাঁসের হুমকি দেওয়া হয়।
তবে এ বিষয়ে ওবায়দুল্লাহর সঙ্গে সাংবাদিকদের যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
মরিয়ম বেগমের একটি জীবনবৃত্তান্ত পাওয়া গেছে, যেখানে ২২ জুন তারিখে এমপি নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরসহ চাকরির জন্য ‘জোর সুপারিশ’ করা হয়েছে। ওই জীবনবৃত্তান্তে মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে মরিয়ম বেগম বলেন, জীবনবৃত্তান্তটি বিয়ের আগে তৈরি করা হয়েছিল। পরে তার স্বামী সেটিতে স্বাক্ষর করেন।
কোন চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো বেসরকারি চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন।
একজন সংসদ সদস্যের স্ত্রীর ছোটখাটো বেসরকারি চাকরির প্রয়োজন ছিল কি না কিংবা চাকরির আশ্বাস দিয়ে তাকে বিয়ে করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে মরিয়ম বলেন, তিনি পরিবারের সম্মতিতে স্বেচ্ছায় বিয়ে করেছেন এবং নিজের চেয়ে ৫৭ বছর বড় একজনকে বিয়ে করাও তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।
ভিডিও ফাঁসের নেপথ্যে কী?
ভিডিও ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
এমপির ব্যক্তিগত সহকারী আবুল হাসান দাবি করেন, নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত কোনো গাড়ি নেই। তিনি যে ভাড়ার গাড়ি ব্যবহার করেন, তার চালক হচ্ছেন এমপির ‘মামা-শ্বশুর’ ওবায়দুল্লাহ।
আবুল হাসানের ভাষ্য, ১৩ জুলাই মগবাজারে অবস্থানের সময় ওবায়দুল্লাহ গোপনে কক্ষে একটি মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণ করেন। পরে কয়েকজন যুবককে নিয়ে এসে এমপিকে হেনস্তা করে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। এর মধ্যে তিন লাখ টাকা দেওয়া হলেও বাকি সাত লাখ টাকা না পাওয়ায় ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ওবায়দুল্লাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো এক লিখিত অভিযোগে এমপি নজরুল ইসলামকে ‘দুশ্চরিত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এমপির বক্তব্য
জি এম নজরুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, গত ১৩ জুলাই তিনি তার দুই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মগবাজারে মরিয়মের বাবার কার্যালয়ে যান। সেখানে অবস্থানের সময় ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে বাইরে যান। পরে তিনি ৫ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। তারা এমপিকে জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করে এবং ভাড়া করা গাড়িটিও আটকে রাখে।
এমপির দাবি, মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে পূর্বশত্রুতা ও পারিবারিক বিরোধের জের ধরেই ওবায়দুল্লাহ এসব ঘটিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ভিডিও ধারণ, চাঁদাবাজি, চাকরির সুপারিশ এবং অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন