দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভোটের প্রচার চালাচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। সরাসরি নাম উল্লেখ করে কেউ কাউকে দোষারোপ না করলেও প্রচারে দুই দলের শীর্ষ নেতারাই পরোক্ষভাবে অপর পক্ষের দিকে ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলেছেন।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে গাজীপুরের রাজবাড়ী মাঠে জেলা ও মহানগর জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত নির্বাচনি জনসভায় কোনো দলের নাম সরাসরি না বলে আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে একজন মানুষ বাংলাদেশে নিরাপদে থাকতে পারবে না। একজন ব্যবসায়ী নিরাপদে ব্যবসা করতে পারবে না। একজন শ্রমিক নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারবে না। কৃষক শান্তিতে মাঠে ফসল ফলাতে পারবে না। তারা সবার শান্তি নষ্ট করবে।
জনসভায় তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, একটি দল ৪৯ ঋণখেলাপিকে মনোনয়ন দিয়েছে। ঋণখেলাপিদের বগলের নিচে রাইখা যদি বলে, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ব, তাহলে বিষয়টা হবে আপনারা যা বলেন, তা করেন না এবং যা করেন, তা বলেন না।
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক ইস্যু আলোচনায় এসেছে। অ্যাকাউন্ট ফেরত পেলেও একটি পোস্ট ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে তুমুল আলোচনা। বিষয়টি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) খুলনার খালিশপুর প্রভাতী স্কুলমাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতা কর্মজীবী নারীদের নিয়ে যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা রীতিমতো কলঙ্কজনক ও নিন্দনীয়। নারীদের পেছনে রেখে যত বড় কথাই বলা হোক, কোনোভাবেই দেশ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
তারেক রহমান বলেন, তারা বলে ইসলাম কায়েম করবে, অথচ আমাদের নবী (সা.)-এর স্ত্রী বিবি খাদিজা (রা.) নিজেও একজন ব্যবসায়ী ও কর্মমুখী নারী ছিলেন। যে দলের নেতা এভাবে নারীদের নিয়ে কথা বলে, তারা যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে নারীদের কীভাবে অপদস্থ করতে পারে, তা সহজেই ভাবা যায়। একাত্তরে এ ধরনের উদাহরণ আমরা দেখেছি। ওই দলের পূর্বসূরিরা তখন নারীদের সঙ্গে কী আচরণ করেছিল, ইতিহাস তার সাক্ষী।
জনসভায় তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগেই দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ঘরের মধ্যে বন্দি রাখতে চায়, নারীদের নিয়ে অসম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করে। যারা মানুষের মর্যাদা বোঝে না, তাদের হাতে কেউ নিরাপদ থাকতে পারে না। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প থেকে শুরু করে প্রতিটি পরিবারে নারীরা এখন সংসার চালাচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে স্বামী-স্ত্রী দুজনই উপার্জন করছেন। অথচ একটি দল তাদের অপমান করছে।
নারীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, মা-বোনদের বলব, যারা নারীদের অপমান করে, তাদের কীভাবে জবাব দেবেন, তা ভেবে দেখুন। যে দলে নারী সদস্য রয়েছে, সে দলই যদি নারীদের অবমাননা করে, তাহলে তাদের প্রকৃত পরিচয় কী—সেই প্রশ্ন জনগণকেই করতে হবে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হওয়ার পর ওই দল দাবি করেছে, তাদের আইডি হ্যাক হয়েছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো ধরনের হ্যাকিং হয়নি। নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে।
একই দিনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগে মায়ের মর্যাদা, তারপর ফ্যামিলি কার্ড। মানুষ কোনো কার্ডের ধার ধারে না। মায়েদের গায়ে হাত দিলে আগুন জ্বলে উঠবে। ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না।
তিনি বলেন, আমরা তাদের মতো অতীতে কাসুন্দি টেনে জাতিকে আর বিভক্ত করতে চাই না। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমাদের পক্ষে জনজোয়ার দেখে তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচন আটকে দিয়েছে। তারা বেকার ভাতা দেওয়ার কথা দিয়ে যুবকদের অসম্মানিত করতে চাইছে। আমরা যুবকদের অসম্মানিত করতে চাই না।
জামায়াত আমির বলেন, তারা এতদিন হ্যাঁ ভোটের কথা বলেনি। ঠেলার নাম বাবাজি। এখন আস্তে আস্তে গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার কথাও বলছে। তাদের মুখের কথা যেন বুকের কথা হয়, সেটা দেখতে চাই।
এর আগে গত ২২ জানুয়ারি সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে এক সমাবেশে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি না হলেও জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন। দলটির বিরুদ্ধে তিনি মিথ্যাচার করা, মানুষকে ঠকানো ও শিরিক করার অভিযোগ আনেন। এমনকি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা কথাও টেনে আনেন।
তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগেই একটি দল এই দেব, ওই দেব বলছে; এমনকি বেহেশতের টিকিট দেবেও বলছে। যেটার মালিক আল্লাহ, সেটা দেওয়ার কথা যদি তারা বলে, তাহলে তা বিষয়টি তো শিরক হচ্ছে। সবকিছুর ওপরে আল্লাহ'র অধিকার। কাজেই তারা আগেই তো আপনাদের ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তাহলে কেমন ঠকান ঠকাবে, বোঝেন এবার।
মৌলভীবাজারের শেরপুরে এক নির্বাচনি সমাবেশে তারেক রহমান তিনি বলেন, আরে ভাই, আপনাদের তো মানুষ একাত্তরে দেখেছে। ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। একাত্তরে মানুষ দেখেছে আপনারা কীভাবে দেশের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে, গত ২২ জানুয়ারি প্রচারের প্রথম দিন মিরপুর-১০ নম্বরের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত সমাবেশে ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান নির্বাচনি প্রচারে আমি কারো সমালোচনা করতে চাই না বললেও ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেন।
সমাবেশে তিনি বলেন, এই দেশে আর ফ্যাসিবাদের ছায়া দেখতে চাই না। ফ্যাসিবাদ এখন যদি নতুন কোনো জামা পরে সামনে আসে, ৫ আগস্ট যে পরিণতি হয়েছিল, সেই নতুন জামা পরা ফ্যাসিবাদের একই পরিণতি হবে।
জনগণের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা কি নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চান? আমরা নতুন কোনো ভোট ডাকাত দেখতে চাই না। চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য, মামলাবাজি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, পাথর মেরে লোক হত্যা, গাড়ি চাপা দিয়ে লোক হত্যা, এগুলো থেকে যারা নিজের কর্মীকে বিরত রাখতে পারবে, তারাই জনগণকে আগামীর বাংলাদেশ উপহার দিতে পারবে। যারা এগুলো পারবে না, তারা যত রঙিন স্বপ্নই দেখাক, জাতি তাদের মতলব বুঝতে পারবে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একই পরিবার থেকে বারবার সরকারপ্রধান চায় না জামায়াত; বরং এমন ব্যবস্থা চায়, যাতে ভিক্ষুকের সন্তানও প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।
এদিন বিকেলে কারওয়ান বাজারে জনসভায় নির্বাচনি প্রচারে তিনি বলেন, এক হাতে ফ্যমিলি কার্ড আর আরেক হাতে নারীদের হেনস্তা চলতে পারে না।
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, আফসোস, তারাই আবার নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলছেন। এক হাতে ফ্যামিলি কার্ড, আরেক হাতে আমার মায়ের গায়ে হাত—এ দুইটা আমরা দেখতে চাই না। মায়েরা আপনাদের কারো কাছে ফ্যামিলি কার্ড চায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিরাজমান, তাতে শুধু অন্যকে হেয় করা বা দোষারোপ করা, প্রতিপক্ষকে হেনস্তার মুখোমুখি করার মতো ভাষা ব্যবহার করা হয়। কারণ দলগুলো মনে করে, অন্যকে নিচু করার মধ্য দিয়ে জয় নিশ্চিত হবে।
বিএনপি ও জামায়াত, দুই দলই বলেছে যে, তারা দোষারোপের রাজনীতি করবে না। বরং, তারা শুধু নিজেদের প্রচারণা চালিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দুই দলই তাদের দেওয়া কথা রাখছে না। বরং বাংলাদেশের পূর্বের অপরাজনীতির সংস্কৃতির পুনরুৎপাদন চলছে এবং নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এগুলোর প্রবণতা আরও বাড়বে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও বলেন, প্রচারণার সময় প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার যে রীতি, এটি ভোটের ময়দানে জনমত তৈরির ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। কারণ অনেক সময় ভোটাররা মিথ্যাকেও সত্য মনে করে। সেই সঙ্গে এখন দলগুলো বিপরীত মেরুতে হাঁটলেও নির্বাচন শেষে তারা এগুলো ভুলেও যেতে পারে। এই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেও যেতে পারে। আজকে যারা পরস্পরকে শত্রু মনে করছে, ভবিষ্যতে তারা কাছাকাছিও আসতে পারে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে তো কিছু নেই।




সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন