ফুটবল মাঠে তিনি যখন গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ান, তখন তাকে মনে হয় এক নির্ভীক প্রহরী। কিন্তু সেই ইস্পাতকঠিন মানুষটির বুকের ভেতর যে কতটা রক্তক্ষরণ আর ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, তা হয়তো বিশ্ববাসী সেদিনই প্রথম টের পেয়েছিল— যেদিন ওয়েস্ট ব্রমের বিপক্ষে গোল করে তিনি দুই হাত আকাশে তুলে অঝোরে কাঁদছিলেন। সেই অশ্রু ছিল একজন বিশ্বসেরা গোলরক্ষকের নয়, বরং একজন শোকার্ত সন্তানের, যিনি তার বাবাকে আকাশ পানে খুঁজছিলেন।
অ্যালিসনের জীবনের সেরা স্মৃতিগুলো কোনো বড় স্টেডিয়ামের নয়, বরং তাদের শোবার ঘরের পুরনো কার্পেটের। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে তার বাবা যখন সোফায় এলিয়ে পড়তেন, তিন বছরের খুদে অ্যালিসন আর বড় ভাই মুরিয়েল তখন শুরু করতেন তাদের 'ওয়ার্ল্ড কাপ'।

ক্লান্ত বাবা সোফার নিচ থেকে হাত বাড়িয়ে বাধা দিতেন বলকে। চিৎকার করে বলতেন, আজ তোমরা গোল করতে পারবে না, আমিই তাফারেল! সেই অন্ধকার সোফার তলা থেকে বেরিয়ে আসা বিশাল হাত দুটোই ছিল অ্যালিসনের প্রথম অনুপ্রেরণা। তিনি জানতেন না, একদিন সেই হাত দুটোর উত্তরাধিকারী হয়ে তিনিও বিশ্বজয় করবেন।
২০২১ সাল। লিভারপুল যখন প্রিমিয়ার লিগের লড়াইয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ব্রাজিলের এক শান্ত হ্রদের পাড়ে ঘটে যায় সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বাবা আর নেই— এই খবরটি যখন অ্যালিসনের কানে পৌঁছায়, তিনি তখন হাজার মাইল দূরে। মহামারি আর নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকা পড়ে এক অসহায় পুত্র। বাবার কফিন ছোঁয়ার অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছিল নিষ্ঠুর সময়।

অ্যালিসন জানান, সবকিছু ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল এত শক্তিশালী একজন মানুষ কীভাবে চলে যেতে পারেন? আমি একা ছিলাম, শুধু ফেসটাইমের পর্দায় বাবাকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলাম। কিন্তু আজ বুঝতে পারি, ভালোবাসার কাছে কোনো দূরত্বই বাধা নয়।

শোকের সেই কালো মেঘে অ্যালিসনের জন্য ধ্রুবতারা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘লিভারপুল’। ইয়ুর্গেন ক্লপ কেবল তার কোচ ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন এক পরম আশ্রয়দাতা। সতীর্থরা নিজেরা টাকা জমিয়ে ব্যক্তিগত ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। এমনকি প্রতিপক্ষ কোচ পেপ গার্দিওলা ও আনচেলত্তির পাঠানো সমবেদনা বার্তাগুলো তাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল— কিটের নিচে মানুষটিই আসল।
বাবার মৃত্যুর কয়েক মাস পরের সেই রাত। ঘড়ির কাঁটা থমকে দাঁড়িয়েছে। লিভারপুলের অস্তিত্ব তখন সংকটে। গোলপোস্ট ছেড়ে মাঝমাঠ পেরিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে যখন অ্যালিসন ছুটে গেলেন, তখন তিনি একজন গোলরক্ষক ছিলেন না, ছিলেন এক অদম্য জেদ।
ট্রেন্টের কর্নার থেকে আসা বলে যখন তিনি মাথা ছোঁয়ালেন, গ্যালারি শূন্য থাকলেও এক অভাবনীয় উষ্ণতায় ভরে গিয়েছিল তার চারপাশ।
অ্যালিসন জানালেন, সেই হেডটি কেবল তিনি করেননি, বরং স্বর্গ থেকে বাবার অদৃশ্য হাতটি বলের অভিমুখ বদলে দিয়েছিল। সেদিন আকাশ পানে তাকিয়ে তিনি বলেছিলেন— বাবা এটা তোমার জন্য।

আজকাল যখন লিভারপুলের ট্রেনিং শেষে অ্যালিসন ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরেন, তার ৫ বছর বয়সী ছেলে মাত্তিও বল হাতে দৌড়ে আসে। অ্যালিসন এখন সেই বাবার ভূমিকায়। তিনি এখন সোফার নিচে শুয়ে পড়ে হাত বাড়িয়ে দেন। মাত্তিও যখন চিৎকার করে হাসে, অ্যালিসন তখন সেই হাসির প্রতিধ্বনিতে নিজের বাবাকে খুঁজে পান।
অ্যালিসন শিখিয়েছেন, জীবনের ঝড়ে স্বপ্নগুলো যখন লন্ডভন্ড হয়, তখনও মানুষ একা থাকে না। বাবার সেই ফেলে যাওয়া 'গ্লাভস' আর সন্তানদের এই কলরব— এর মাঝেই মিশে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সুর।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন