ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ইরানের হাতে মার্কিন বাংকার বাস্টার, যুদ্ধে নতুন মোড়

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
বাংকার-বাস্টার বোমা। ছবি : সংগৃহীত

ইরান দাবি করেছে, তারা ১৫টিরও বেশি অবিস্ফোরিত মার্কিন নির্ভুল-নির্দেশিত যুদ্ধাস্ত্র উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে অন্তত একটি সম্পূর্ণ অক্ষত জিবিইউ-৫৭ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (এমওপি) বাংকার-বাস্টার বোমা রয়েছে। যদি এই দাবি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার হামলা প্রযুক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচন করতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোর মতে, উদ্ধার করা এসব অস্ত্র কেবল ধ্বংসাবশেষ নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ প্রযুক্তি উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ফোরডোর মতো গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় অবিস্ফোরিত বোমা রয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শন জটিল হয়ে উঠেছে।

তার মতে, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর কার্যক্রমেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে এবং পারমাণবিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

ঐতিহাসিক নজির

২০১১ সালে ইরান একটি মার্কিন আরকিউ-১৭০ স্টিলথ ড্রোন অক্ষত অবস্থায় জব্দ করেছিল। পরবর্তীতে সেই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তারা শাহেদ-১৭১ এবং শাহেদ-১৯১ ড্রোন তৈরি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এবার একাধিক উন্নত অস্ত্র এক সঙ্গে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জিবিইউ-৫৭-এর সামরিক গুরুত্ব

প্রায় ৩০ হাজার পাউন্ড (১৩.৬ টন) ওজনের জিবিইউ-৫৭ যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বাঙ্কার-বাস্টার অস্ত্রগুলোর একটি। এটি ভূগর্ভস্থ শক্তিশালী স্থাপনা ধ্বংস করার জন্য তৈরি। ইরানের দাবি অনুযায়ী, চারটি জিবিইউ-৫৭ উদ্ধার করা হয়েছে- যার মধ্যে তিনটি ধ্বংস করা হয়েছে এবং একটি গবেষণার জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া হাজার হাজার ক্লাস্টার বোমলেট, রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অবিস্ফোরিত অস্ত্র থেকে গাইডেন্স সিস্টেম, ফিউজিং প্রযুক্তি, বিস্ফোরণ কাঠামো এবং সম্ভাব্য দুর্বলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে ইরান একদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে পারে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ হামলার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। আংশিক প্রযুক্তিগত জ্ঞানও প্রতিপক্ষের আক্রমণ পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলতে সক্ষম।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ

এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত উভয় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সংবেদনশীল অস্ত্র প্রযুক্তির সম্ভাব্য ফাঁস, ভবিষ্যৎ হামলার কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে পুনঃসরবরাহে বিলম্ব- এসব বিষয় বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। জিবিইউ-৫৭ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সীমিত সংখ্যায় উৎপাদিত হওয়ায় প্রতিটি ক্ষতির কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি।

এই ঘটনার প্রভাব শুধু ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। প্রযুক্তিগত তথ্য মিত্র দেশ বা প্রক্সি গোষ্ঠীর কাছে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিরক্ষা-কেন্দ্রিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের পূর্ব-প্রতিরোধমূলক হামলার কৌশলও চাপে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধে কেবল শত্রুর স্থাপনা ধ্বংস করাই নয়, বরং নিজের প্রযুক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের এই দাবি সত্য হলে, তা বৈশ্বিক সামরিক কৌশলে একটি নতুন বাস্তবতার সূচনা করতে পারে।