শীতকাল তরুণ প্রজন্মের কাছে স্বপ্নের মৌসুম। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে উঁকি দেওয়া আধমরা রোদের মতো এই সময় তারা বাঁচতে চায় ব্যান্ড সংগীতের উষ্ণ সুরে, গানের জাদুময় মুহূর্তে। তবে গত বছর দেশের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে সেই প্রত্যাশার পূর্ণতা মেলেনি। ক্যালেন্ডারের নতুন পাতায় কতটা মিটবে সে প্রত্যাশা? এ বিষয়ে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছে দেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্যান্ড, জানিয়েছে চলতি বছরকে ঘিরে তাদের পরিকল্পনার কথা। তুলে ধরেছেন আরফান হোসাইন রাফি।
নতুন দুটি গানের কাজ চলছে
তানযীর তুহীন, আভাস
‘কত প্রশ্নের বনে হারিয়ে জড়িয়ে, বোঝে না তবু এ মন, শান্ত নিবিড় পথে হেঁটে কাটে সারাদিন সারাক্ষণ’—জনপ্রিয় বাংলা রক ব্যান্ড ‘আভাস’ তাদের স্বনামের ট্র্যাকের মতোই কাটিয়েছে ২০২৫ সাল। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে তারা সামলেছে খুব গোপনে এবং প্রকাশ্যে এনেছে আশার বাণী। অতীতের পাঁচটি মৌলিক গান ভক্তদের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার পর গত বছর প্রকাশ পায় ব্যান্ডটির ষষ্ঠ গান ‘সত্তা’।
সব মিলিয়ে গত বছর আভাস ব্যান্ডের জন্য কেমন ছিল—এই প্রশ্নের উত্তরে ভোকাল তানযীর তুহীনের বক্তব্য, ‘আলহামদুলিল্লাহ,ভালো। সবার জন্য যেমন ছিল, আমাদের জন্যও তেমনই ছিল। এর মধ্যেই চলছে, আলহামদুলিল্লাহ।’
এ বছরের পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বলেন, এ বছর নতুন গান হবে, নতুন সুর হবে, এই তো আমাদের প্রত্যাশা আর পরিকল্পনা। গত বছর ‘সত্তা’ প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই নতুন দুটি গানের কাজ চলছে। আর কিছুটা এগিয়ে গেলে তারপর বিস্তারিত সামনে আনব, ইনশাল্লাহ ছাব্বিশেই দেওয়ার চেষ্টা করব।
পুরোনো কিছু গান নতুন করে করার পরিকল্পনা আছে
জোহাদ রেজা চৌধুরী, নেমেসিস
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে গড়ে ওঠা অলটারনেটিভ রক ব্যান্ড নেমেসিসের গত বছরটি কেটেছে কিছুটা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে। দেশের অস্থির ও ছন্নছাড়া পরিস্থিতির কারণে কনসার্টের সংখ্যা কমে এলেও, আনন্দের খবর ছিল তাদের নতুন অ্যালবাম ‘ভিআইপি’র প্রকাশ। এ কারণে চলতি বছরে নতুন অ্যালবাম না এলেও কনসার্ট ও নতুন গানের মাধ্যমে ভক্তদের জন্য সুখবর দিতে প্রস্তুত ব্যান্ডটি।
এ বিষয়ে নেমেসিসের জোহাদ বলেন, দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় গত বছর আমাদের জন্য একটু আপ অ্যান্ড ডাউন ছিল। তবে ভালো দিক হলো, আমাদের একটা অ্যালবাম বের হয়েছে, ‘ভিআইপি’। গত বছরটা অনেক দিক থেকে পজিটিভ, আবার কিছু দিক থেকে নেগেটিভও। আমরা আরও বেশি শো করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দেশের পরিস্থিতির কারণে শো-এর সংখ্যা কিছুটা কমে আসে। তবে সব দিক বিবেচনায় আমরা ভালো আছি, তাই খারাপ বলা যাবে না।
চলতি বছরের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেহেতু গত বছর অ্যালবাম বের হয়েছে, তাই এ বছর নতুন অ্যালবাম না হলেও কয়েকটি একক গান করার ইচ্ছে আছে। পাশাপাশি আমাদের পুরোনো কিছু গান নতুন করে করার পরিকল্পনাও ছিল। সেটি গত বছর সম্ভব হয়নি, তবে আশা করছি এ বছর তা বাস্তবায়ন করা যাবে।’
অ্যালবাম প্রকাশ করার প্রবল ইচ্ছা
রায়েফ আল হাসান রাফা, এভোয়েডরাফা
গত বছরটি ব্যান্ড এভোয়েডরাফার জন্য ছিল তুলনামূলকভাবে শান্ত ও স্থিরতার এক অধ্যায়। সময়টা একেবারে নিখুঁত না হলেও, সব মিলিয়ে সন্তোষজনকই বলা যায়। দেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় যেখানে সবাইকে নানা ঝামেলা ও চাপ সামলাতে হয়েছে, সেখানে এভোয়েডরাফাও তার বাইরে ছিল না। তবুও সব প্রতিকূলতার মাঝেই নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারাটাই ছিল ব্যান্ডটির সবচেয়ে বড় সাফল্য।
এ বিষয়ে ব্যান্ডের ভোকাল রাফা বলেন, ‘গত বছরটা এভোয়েডরাফা ব্যান্ডের জন্য মোটের ওপর স্থির ছিল। একেবারে খারাপ না; বরং বলা যায়, যথেষ্ট ভালোই ছিল। অবশ্য বাংলাদেশের সবাইকেই নানা ঝামেলা ও চাপের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এত কিছুর মাঝেও আমরা সবাই এক সঙ্গে ঠিকঠাক থাকতে পেরেছি। আমার ব্যান্ডের প্রতিটি সদস্যকে নিয়ে আমি গর্বিত। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, আমরা আমাদের জায়গায় দৃঢ় ছিলাম, এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
নতুন বছরের প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন বছরে আমার একটাই প্রত্যাশা, নিজেকেই চমকে দেওয়া। সেই সঙ্গে আমাদের অ্যালবাম প্রকাশ করার প্রবল ইচ্ছা আছে এবং সেই আশাটাই ধরে রাখছি। আমরা এই অ্যালবাম নিয়ে বহু বছর ধরে কাজ করছি। মূল পরিকল্পনা ছিল গত বছরের শেষের দিকেই এটি প্রকাশ করার, কিন্তু নানা বাস্তবতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবুও আমরা আশাবাদী যে এ বছর আমাদের জন্য ভালো কিছু নিয়ে আসবে।’
পঞ্চম অ্যালবামের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে
শারমিন সুলতানা সুমি, চিরকুট
সৃজনশীল দিক থেকে ব্যান্ড ‘চিরকুট’-এর জন্য গত বছরটি ছিল বেশ আনন্দময়। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে প্রকাশ পায় তাদের চতুর্থ অ্যালবাম ‘ভালোবাসাসমগ্র’। ফলে চলতি বছরেও ভক্তদের জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে এগিয়ে যেতে চায় ব্যান্ডটি।
চিরকুটের প্রধান গায়িকা শারমিন সুলতানা সুমি বলেন, ক্রিয়েটিভ জায়গা থেকে গত বছর আমরা অনেক খুশি ছিলাম। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও আমাদের চতুর্থ অ্যালবাম ‘ভালোবাসাসমগ্র’র দশটি গান প্রকাশ করতে পেরেছি। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই গানগুলো খুবই দরকার ছিল বলে মনে করি। আমরা প্রত্যাশা করি, আমাদের দেশে শান্তি ফিরে আসুক। সবাই সুস্থ মনে যার যার কাজ করতে পারুক, আর আমরা যেন আরও বেশি করে গান করতে পারি।
এ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘ইনশাল্লাহ এ বছরও পঞ্চম অ্যালবামের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। যত বাধাই আসুক না কেন, এটাকে আমরা আরও বেশি করে ভালোবাসার বছর হিসেবে দেখতে চাই। বরাবরের মতো গান নিয়েই আপনাদের পাশে থাকব, কথা দিলাম।’
আশা করি অনেক নতুন গান উপহার দিতে পারব
জুনায়েদ ইভান, অ্যাশেজ
ব্যান্ড অ্যাশেজের জন্য গত বছরটি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। দেশের পরিস্থিতির শেকল ভেঙে কনসার্টের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে এ ব্যান্ড ছিল ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। বছরজুড়ে দেশ ও দেশের বাইরের বড় বড় মঞ্চে পারফর্ম করে গেছে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় এই ব্যান্ডটি। এর ফলে গত বছরে অ্যাশেজের পক্ষ থেকে বড় কোনো নতুন প্রকাশনা দেখা যায়নি। বছরজুড়েই গানের নতুন কোনো খবর পাওয়া যায়নি ভক্তদের জন্য। তবে নতুন বছরের শুরুতেই আশার আলো দেখালেন ব্যান্ডের ভোকাল জুনায়েদ ইভান।
নতুন বছরের পরিকল্পনা জানাতে সংক্ষিপ্ত উত্তরে তিনি বলেন, ‘আশা করি, এই বছরে আমরা আরও অনেক নতুন গান উপহার দিতে পারব।’
খবর আছে দুই হাজার ছাব্বিশ
প্রবর রিপন, সোনার বাংলা সার্কাস
খবর আছে দুই হাজার ছাব্বিশ! সাইকেডেলিক রক ব্যান্ড সোনার বাংলা সার্কাসের এ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রবর রিপনের ভাষায় এমনটাই বলা যায়।
গত বছর কেমন কেটেছে এবং নতুন বছরের ভাবনা প্রসঙ্গে নিজের স্বকীয় ভঙ্গিতেই তিনি বলেন, ‘গত বছর ভালো ছিল ভালো ছিল। আর এ বছর সারপ্রাইজ আছে। কী সারপ্রাইজ, সেটা বলা যাবে না, বলে দিলে তো সারপ্রাইজ থাকল না। তবে সার্কাসিয়ানদের জন্য সারপ্রাইজ আছে।’
প্রতি মাসে অন্তত একটি করে নতুন গান প্রকাশ করতে চাই
তাসরিফ খান, কুঁড়েঘর
জনপ্রিয় ফোক এবং এক্সপেরিমেন্টাল ব্যান্ড কুঁড়েঘরের জন্য গত বছরটি ছিল সংগ্রামমুখর। তবে সেই সংগ্রামের মাঝেও ছিল সৃষ্টির আনন্দ ও আশার খবর। বছরজুড়ে পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলোই ব্যান্ডটিকে নতুনভাবে ভাবতে ও নিজেদের পুনরাবিষ্কার করতে সাহায্য করেছে।
এ বিষয়ে ব্যান্ডের ভোকাল তাসরিফ খান বলেন, ‘গত বছরটা আমাদের জন্য কিছুটা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেলেও একেবারে খারাপ বলা যাবে না। সেই অভিজ্ঞতাগুলো থেকেই আমরা অনেক কিছু শিখেছি, নিজেদের নতুনভাবে বুঝেছি। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, ২০২৫ সালে কুঁড়েঘরের নিজস্ব স্টুডিওর যাত্রা শুরু হয়েছে। এটা আমাদের জন্য সত্যিই একটি বিশেষ মাইলফলক।’
নতুন বছরের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘এ বছর আমরা আরও বেশি মনোযোগী ও পরিকল্পিতভাবে এগোতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হলো প্রতি মাসে অন্তত একটি করে নতুন গান প্রকাশ করা। ভক্তদের জন্য আমরা কুঁড়েঘরকে নতুনভাবে সাজাচ্ছি। চেষ্টা থাকবে বিভিন্ন ধরনের এক্সপেরিমেন্টাল গানে কাজ করার, যেন প্রতিটি গানেই নতুন কিছু পাওয়া যায়।’
অসম্পূর্ণ অ্যালবামের গান প্রকাশ করার চেষ্টা করব
হাসান ইথার, হাইওয়ে
ব্যান্ড হাইওয়ের জন্য গত বছরটি দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় খুব খারাপ ছিল না। কিছু কনসার্ট ও গানের মধ্য দিয়েই কেটেছে সময়।
সেই অভিজ্ঞতা আর নতুন বছরের ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভোকাল হাসান ইথার বলেন, দুই হাজার পঁচিশে আমার মনে হয়, আমরা সবাই (সব ব্যান্ড) প্রায় একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই গিয়েছি, যেমনটা আমাদের দেশও একটি বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর বাইরে হাইওয়ের কিছু গান রিলিজ হয়েছে, মানুষ সাড়া দিয়েছে। এটা কখনোই ফর গ্রান্টেড নয়, তাই আমরা খুশি। কিছু শো হয়েছে, সব মিলিয়ে দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় খুব খারাপ বলা যায় না। আর নতুন বছরে অসম্পূর্ণ অ্যালবাম ‘যাচ্ছি কোথায়’—এর বাকি ৮টি গান প্রকাশ করার চেষ্টা করব। এরপর পরবর্তী অ্যালবাম ‘আয়াহুয়াস্কা’র বাকি গানগুলোও প্রকাশ করার চেষ্টা থাকবে। প্রত্যাশা বরাবরের মতোই এক। কোনো প্রত্যাশা নেই, যা হওয়ার হবে। নিজের মানসিক শান্তির জন্যই গান বানাব। আমার যেসব গান এখনো অপ্রকাশিত রয়েছে, সেগুলো রেকর্ড করতে পারলে নিজের কাছেই নিজেকে হালকা মনে হবে। এ বছর থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে একটু বেশি একা থাকার চেষ্টা করব। পাবলিক ইন্টারঅ্যাকশন কমাব, নিজেকে সময় দেব, এইটুকুই। বাকিটা শ্রোতাদের ওপরই নির্ভর করে।



সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন