গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলা ও অবরোধের কারণে মানবিক সংকট ক্রমেই ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ৯৫,০০০ শিশুর তীব্র অপুষ্টি শনাক্ত হয়েছে এবং অন্তত ৩১ শিশু অনাহারে মারা গেছে। গত দুই বছরে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনে ৩৩,০০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার অধিকাংশই নারী ও শিশু। স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ফার্টিলিটি ক্লিনিক ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন ও গাজার পুনর্গঠন বিপন্ন।
গাজার মানবিক বিপর্যয় তীব্র হচ্ছে
গাজার হাসপাতাল ও ফার্টিলিটি ক্লিনিকগুলোতে ইসরায়েলি হামলার ফলে সেখানকার শিশু ও নারী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। জাতিসংঘের মতে, ১০০,০০০-এর বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে আছে এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শিশুরা তীব্র শীত ও অপুষ্টির মধ্যে জীবনযাপন করছে।
প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, শুধু অনাহার ও পানিশূন্যতায় ৩১ শিশু মারা গেছে। শীতে তাঁবুতে থাকা শিশুদের জীবনের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। গাজার স্বাস্থ্যকর্মীরা সীমিত ওষুধ ও ত্রাণের মধ্যেও শিশুদের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২৮,০০০ পরিবারের মধ্যে তাঁবু, কম্বল ও ত্রিপল বিতরণ করা হলেও এখনো ১১ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার জন্য অপেক্ষমাণ। খাদ্য সংকট ও অবরোধ পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলেছে।
ইসরায়েলের সামরিক চাপ ও হামাসের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেছেন, হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্রীকরণ না করা পর্যন্ত গাজায় পুনর্গঠন সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে দুটি পথ আছে – সহজ বা কঠিন। তবে গাজা নিরস্ত্রীকরণের আগে কোনো ইটও গাঁথতে দেব না।’ নেতানিয়াহু আরও সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি ভুল পদক্ষেপ নেয়, তবে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া অতীতের চেয়ে ভয়াবহ হবে।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম জানিয়েছেন, ফিলিস্তিনের ১০ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা এবং নিরাপত্তাকর্মীদের নতুন প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে ইসরায়েল হামাসের যেকোনো ভূমিকা কঠোরভাবে বিরোধিতা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও, দু’পক্ষই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে।
গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি সেনারা বিমান ও কামান হামলা চালাচ্ছে। জাবালিয়া, দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিসে সামরিক যান থেকে মেশিনগানের গুলিবর্ষণ ও বাড়ি ধ্বংসের ঘটনা ঘটেছে। গত এক বছরে ৪৮৬ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,৩৪১ জন আহত হয়েছেন।
ট্রাম্পের ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ও পুনর্গঠনের বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার গাজার পুনর্গঠন নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান ঘোষণা করেছেন। এতে আবাসিক ভবন, সমুদ্রতীরবর্তী অবকাশ কেন্দ্র, বিমানবন্দর এবং তথ্য কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই পরিকল্পনা তৈরি হওয়ায় এটি বিতর্কিত।
কুশনার জানিয়েছেন, গাজার পুনর্গঠন শুরু হবে শুধু ইসরায়েলি সেনার প্রত্যাহার এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পর। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আবাসন ও মানবিক নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
মানবিক সহায়তার চ্যালেঞ্জ
দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও খাদ্য, পানি ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো সীমিত। ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের সাতজন সহায়ক নিহত হওয়ার পর গাজায় তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো ৭৬,০০০ শিশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছে এবং প্রায় ৪,৯০০ তীব্র অপুষ্টি শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ৮২০ শিশু গুরুতর অবস্থায়।
গাজার শিশুদের ৫০,০০০-এর বেশি তীব্রভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে। শিশুরা শীতে তাঁবুতে বসবাস করছে, যার ফলে জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ইসরায়েলি বসতি ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি
২০২৫ সালে পশ্চিম তীর জুড়ে ৩৭,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও সহিংসতা রেকর্ড সংখ্যায় বেড়েছে। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ১,১০৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত, ১১,০০০ আহত এবং ২১,০০০ আটক হয়েছেন। আন্তর্জাতিক আদালত ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনি ভূখ-ে ইসরায়েলের দখল অবৈধ ঘোষণা করেছে।
ইসরায়েলি সেনা ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা হামলা অব্যাহত রাখছে। গাজার পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বেড়েছে।
দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং গাজার মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য জরুরি।
গাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফ্লাইট বাতিল এবং সীমান্ত তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, সীমান্ত শুধু সীমিত মানুষের যাতায়াতের জন্য খোলা হবে।
মানবিক বিপর্যয় ও শিশুদের দুর্দশা
গাজার শিশুদের জন্য খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার তীব্র সংকট চলছেই। ইউনিসেফ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরও প্রতিদিন অন্তত একজন শিশু নিহত হচ্ছে। গত দুই বছরে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৭১,৬৫৭ এবং আহত ১,৭১,৩৯৯ ছাড়িয়েছে। ইসরায়েলি হামলার কারণে গাজার ৯০% অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে, যা পুনর্গঠনে প্রায় ৭,০০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে।
মানবিক সংকটের মধ্যে শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সব কিছুই ধ্বংসের মুখে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।
উত্তর গাজা উপত্যকার ইজরায়েলের সাথে ইরেজ ক্রসিং পয়েন্টের সামনে গাজা সিটিতে তাদের বাড়ির বাইরে খেলার সময় ফিলিস্তিনি শিশুরা হাসছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন