যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে হাজারো মানুষকে নিঃস্ব করার এক ভয়ংকর ফাঁদ পেতেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম ওরফে ‘পানি জাহাঙ্গীর’ ও তার সহযোগীরা। উচ্চাভিলাষী জীবন আমেরিকার নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ থেকে ৮০ লাখ টাকার বিনিময়ে দুর্গম পথে মানুষ পাচার করেছে এই চক্র। গত ২০২০ ও ২০২১ সালে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন বলে বিশেষ সূত্রে জানা গেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, যারা এভাবে অবৈধভাবে গেছেন, তাদের অনেককেই শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে হচ্ছে শূন্য হাতে। অনেকেই সেখানে কারাবন্দি জীবন-যাপন করছেন। আবার অনেকেই আমেরিকার পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে আছেন। শুধু তাই নয়, দেশ থেকে আমেরিকায় নেওয়ার পথে পথে রয়েছে এই পানি জাহাঙ্গীর চক্রের ডেরা। সেখানে আমেরিকায় যেতে ইচ্ছুক মানুষকে আটকে মারধর করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণও আদায় করা হয় তাদের স্বজনদের কাছ থেকে।
এ ছাড়া এই পথে যাওয়ার সময় পাড়ি দিতে হয় ঘন জঙ্গল, দুর্গম পথ; যেখানে রয়েছে হিংস্র বন্যপ্রাণী ও ডাকাতের আক্রমণের ভয়, সঙ্গে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা। এতে অনেক সময়ই নিহত হন অভিবাসী প্রত্যাশী সাধারণ মানুষ। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে লেগেছে এক থেকে দেড় বছর বা তারও বেশি সময়।
প্রতারণার শিকার এমন ৩৬ বাংলাদেশি গত ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরেছেন নিঃস্ব হয়ে। তারা দেশটির অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানে ধরা পড়েন।
ফেরত আসা এই বাংলাদেশিরা জানান, পানি জাহাঙ্গীরের সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র তাদের কারো কাছ থেকে ৪০ লাখ, কারো কাছ থেকে ৫০ লাখ আবার কারো কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে দেওয়ার ও নিরাপদ জীবনযাপনের কথা বলে। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ধারদেনা করে, জমি বিক্রি করে দালালদের টাকা দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে এখন ফিরেছেন শূন্য হাতে, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে।
তথ্যমতে, শুধু এই ৩৬ বাংলাদেশিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসননীতির কারণে এখন পর্যন্ত ২৯৩ বাংলাদেশিকে ফেরত আসতে হয়েছে এবং তারা প্রত্যেকেই মানব পাচারকারী চক্রের শিকার।
জানা গেছে, শেখ হাসিনার ক্ষমতাকালে এই চক্রের মূল হোতা জাহাঙ্গীর মূলত ইমিগ্রেশন ও বোর্ডিং পাসসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। যেহেতু তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিয়ন ছিলেন, তাই তার দাপট ছিল প্রবল। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ৪০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগে চাকরিচ্যুত জাহাঙ্গীর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করতে শুরু করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের চার্চ অ্যাভিনিউ এবং ম্যাগডোনাল্ড অ্যাভিনিউর সংযোগস্থল এলাকায় থাকেন। এ এলাকা লিটল বাংলাদেশ নামেও পরিচিত। সেখানে অবস্থান করেই জাহাঙ্গীর চালিয়ে যাচ্ছেন তার মানব পাচার সিন্ডিকেট। তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী।
জাহাঙ্গীরের অন্যতম সহযোগী হিসেবে এই সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন আরেক বাংলাদেশি খায়রুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা যাওয়া পর্যন্ত সবকিছু মনিটর করেন। নিজের স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে থাকেন খায়রুল। কখনো তিনি জানান তার বাড়ি চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে, কখনো সীতাকুণ্ডে আবার কখনো বলেন নোয়াখালীতে। তিনি বর্তমানে বলিভিয়ায় অবস্থান করছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। খায়রুলের মোবাইল নম্বর + ৫৯১৭৮৫৩৭০৬। এই নম্বর দিয়েই হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সবার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একটি সূত্র জানায়, ফেরত আসা ওই ৩৬ বাংলাদেশি জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বৈধভাবে ব্রাজিলে গিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অবৈধ পথে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন তারা। সেখানে গিয়ে তারা আশ্রয় প্রার্থনা করেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
ভুক্তভোগী এমন দুজন হলেন নোয়াখালীর জাহিদুল ইসলাম ও গাজীপুরের সুলতানা আক্তার।
জাহিদুল ইসলাম জানান, দক্ষিণ আমেরিকা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আশায় তিনি দালালদের হাতে তুলে দেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা। দালালেরা তাদের মেক্সিকোতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে মই দিয়ে উঁচু দেওয়াল টপকে আমেরিকায় পৌঁছান। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছার পর তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তাদের নেওয়া হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে। পরে তারা আশ্রয়ের আবেদন করলেও সঠিক তথ্য দিতে পারেননি দালালদের ভুলে। একসময় তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
আরেক ভুক্তভোগী সুলতানা আক্তার জানান, ব্রাজিল হয়ে মেক্সিকো সীমান্ত পার হতে দালালদের দিয়েছিলেন ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারেননি, ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। এখন তার কিছুই নেই, ঋণের বোঝা ছাড়া। একইভাবে নোয়াখালীর মীর হাসান ৫৫ লাখ, রিয়াদুল ইসলাম ৫০ লাখ ও রাকিব ৬০ লাখ টাকা খরচ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশ করলেও ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে।
দেশের রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে জাহাঙ্গীরের লোকজন রয়েছে। তারাই মূলত মাঠ পর্যায়ে কাজ করে। জাহাঙ্গীর ছাড়াও রাজধানীর পল্টনে নোয়াখালী টাওয়ারে থাকা বিএমএস ট্রাভেলস নামে একটি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চুক্তির মাধ্যমে অবৈধভাবে লোক পাঠিয়ে থাকে। এই চক্রের অন্যতম হোতা এ এ খান বেলাল ও তার ম্যানেজার হারুন। এই কোম্পানিতে দালাল হিসেবে কাজ করা নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির সম্রাটও অনেক বাংলাদেশিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছেন। তাদের সঙ্গে পানি জাহাঙ্গীর চক্রের যোগাযোগ রয়েছে।
ওই ব্যবসায়ী আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে মানব পাচারে জড়িত এই চক্রের সঙ্গে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখার অসাধু কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের লোকজন জড়িত। অবৈধভাবে বাংলাদেশিদের পাঠানোর ক্ষেত্রে এরা ট্যুরিস্ট অথবা ব্যবসায়ী বা জব (চাকরি) ভিসা ব্যবহার করে বেশি। এসব বাংলাদেশিকে এমিরেটসসহ বিভিন্ন কোম্পানির এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের মাধ্যমে পাঠানো হয়।
মানব পাচার নিয়ে কাজ করা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, ফেরত আসা বাংলাদেশিদের জিজ্ঞাসাবাদ করার নিয়ম থাকলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাদের সিআইডিতে ডাকা হয়নি। তাদের পক্ষ থেকেও কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, কয়েক দফায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে যারা ফেরত এসেছেন, তাদের অনেকেই প্রথমে ব্রাজিলে গিয়ে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান। ২০২৫ সালে জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে মোট ১ হাজার ৩২০ জন বাংলাদেশি ব্রাজিলে গেছেন, যার মধ্যে নোয়াখালী জেলারই ৯৫১ জন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন।
১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি পাচার করেছেন পানি জাহাঙ্গীর
ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যবসায়ী জানান, পানি জাহাঙ্গীর যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে শক্তিশালী চক্র গড়ে তুলেছেন। এই চক্রে যুক্ত রয়েছেন খায়রুল নামে এক ব্যক্তি। চক্রটি ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১০ হাজার বাংলাদেশিকে বিভিন্ন রুটে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে ওইসব বাংলাদেশিকে আটক করে ডিটেনশন ক্যাম্পে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ওই সব ব্যক্তির মধ্যে যাদের আত্মীয় আগে থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন, তাদের মাধ্যমে আইনজীবী নিয়োগ করে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করা হয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আশ্রয় পেলেও অধিকাংশ এখনো আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র আরও জানায়, দেশে থাকার সময় পানি জাহাঙ্গীর ও খায়রুল চক্র ৩০ থেকে ৮০ লাখ টাকায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সঙ্গে চুক্তি করত। শর্ত থাকত তাদের যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে দেওয়াসহ কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া। চুক্তির অর্ধেক টাকা দেশে দিতে হতো, বাকি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে পরিশোধের কথা থাকত। বিদেশে যেতে আগ্রহী এসব ব্যক্তিকে অনেক সময় এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন দেশে নিয়ে তাদের ডেরায় আটকে রেখে, নির্যাতন করে স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করত। তখন অনেকে মারাও যেত। সে সময় জাহাঙ্গীর সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী থাকায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভনে দেশ থেকে মানুষকে নেওয়ার পর ব্রাজিল, ভেনেজুয়েলা, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া, হন্ডুরাস ও মেক্সিকোতে আটকে রেখে নির্যাতন, মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে একাধিক চক্র বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছে। ওইসব চক্রের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রেও সক্রিয়। সাধারণত ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সি বেকার ব্যক্তিরা এদের টার্গেট।
যেভাবে পাচার করা হয় যুক্তরাষ্ট্রে
পানি জাহাঙ্গীর চক্রের প্রলোভনে একজন বাংলাদেশি অবৈধভাবে পাড়ি জমিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। রূপালী বাংলাদেশকে তিনি জানিয়েছেন সেই যাত্রাপথের লোমহর্ষক ঘটনা। ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি জানান, তার সঙ্গে চুক্তি হয় ৩০ লাখ টাকায়। জাহাঙ্গীরের পক্ষে মধ্যস্থতা করেন বাংলাদেশের এক দালাল। চুক্তি অনুযায়ী ট্যুরিস্ট ভিসায় বাংলাদেশ থেকে তাকে প্রথমে দুবাই নেওয়া হয়। দুবাই থেকে নেওয়া হয় ব্রাজিলের সাও পাওলোয়। সেখান থেকে নেওয়া হয় ভেনেজুয়েলায়। প্রতিটি যাত্রায় পাচারকারী চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে হাতবদল হন ভুক্তভোগী ব্যক্তি। ভেনেজুয়েলা থেকে তাকে নেওয়া হয় পানামায়। পানামা থেকে পায়ে হেঁটে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে দালালদের সঙ্গে তিনি পৌঁছান কোস্টারিকায়। সেখান থেকে আবার নেওয়া হয় নিকারাগুয়া ও হন্ডুরাসে। পরে পৌঁছান মেক্সিকোতে। মেক্সিকো সীমান্তে ৩০ ফুটের বেশি উঁচু দেওয়াল মই দিয়ে টপকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান ওই ব্যক্তি। এই পথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পথে জঙ্গলের ভয়ংকর পশু-প্রাণীর ভয়, ডাকাতের ভয় তো আছেই, এর সঙ্গে আছে খাবারের অভাব। অনেকে এই পথে বন্যপ্রাণী বা ডাকাতের হাতে পড়ে মারা যান। অনেককে পাচারকারীরা আটকে রেখে নির্যাতন করে তার স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেন। এতে তাদের মৃত্যু পর্যন্ত হয়। অনেকে শ্রেফ খেতে না পেয়ে মারা যান।
ভুক্তভোগী আরও জানান, অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ আটক করে দেশটির ডিটেনশন ক্যাম্পে নেয়। পরে ওই ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তার আত্মীয়দের সহযোগিতায় আইনজীবী নিয়োগ করে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আছেন।
ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি জাহাঙ্গীর ও খায়রুল চক্রের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের দুর্বিষহ বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় তার সঙ্গে জাহাঙ্গীরের সহযোগী ছিলেন। ইমিগ্রেশনে তাদের আগে থেকেই চুক্তি ছিল। তখন জাহাঙ্গীর সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার পিয়ন ছিলেন। আমাকে তার আত্মীয় বলায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনে কোনো জেরার মুখে পড়তে হয়নি। ইমিগ্রেশন পার হয়ে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে উঠি। আগেই বোর্ডিং পাস নেওয়া ছিল। দুবাই পৌঁছার পর আমাকে আরেকটি গ্রুপ রিসিভ করে তাদের ডেরায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে আমাকে পাঠানো হয় ব্রাজিলের সাও পাওলোয়। এরপর ভেনেজুয়েলা, পানামা, কোস্টারিকা, নিকারাগুয়া ও হন্ডুরাস হয়ে আমাকে নেওয়া হয় মেক্সিকোতে। মেক্সিকোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে পৌঁছানোর পর উঁচু দেওয়াল পার হতে বড় মই ব্যবহার করা হয়। মই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর পুলিশের হাতে ধরা পড়লে আমাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আমার লোকজন আইনজীবীর মাধ্যমে আমাকে মুক্ত করে নিয়ে যান।
পুলিশের বক্তব্য
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) মানব পাচার প্রতিরোধ সেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তাফিজুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রই শুধু নয়; ইতালি, গ্রিস, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ট্যুরিস্ট ও ব্যবসায়ী ভিসা নিয়ে বহু বাংলাদেশি অবৈধভাবে পাড়ি জমান। যারা যাচ্ছেন, তারা স্বেচ্ছায় মানব পাচারকারী চক্রকে টাকা দিয়ে যান। একাধিক ট্রাভেল এজেন্সি এই মানব পাচারে জড়িত। তবে এখনো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে পাচারের শিকার হয়েছেন এমন কোনো অভিযোগ সিআইডির কাছে আসেনি। যদি কেউ অভিযোগ করেন, তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে সিআইডি।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ইমিগ্রেশন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে লোকজনকে পাচারের বিষয়টি নজরদারিতে আসার পর ইমিগ্রেশন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। ট্যুরিস্ট ভিসা, ব্যবসায়ী ভিসা বা মাল্টিপল ভিসায় যেসব যাত্রী দুবাই, ব্রাজিলে যাচ্ছেন, তাদের নানাভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়। কাউকে সন্দেহ হলে পাসপোর্ট ব্লক করে দেওয়ার পাশাপাশি তাকে এসবির মূল কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। এ বিষয়ে আমরা সতর্ক হওয়ায় এখন ভিন্নভাবে লোকজন যাচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন