ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমে একদিকে সম্ভাবনা ও আশার সঞ্চার হলেও সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগের কারণ রয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল রোববার সকাল ১১টায় রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন : সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। প্রতিবেদনে টিআইবি বলছে, জুলাই অভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গণরায়ের মূল প্রত্যাশা ছিল সুশাসন, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা।
বিএনপির রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পূর্বশর্তও হলো সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও জনস্বাস্থ্য সংকটের মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করা, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল পরিহার, মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ঘোষণা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নজরদারি জোরদারের মতো পদক্ষেপ সরকারপ্রধানের সদিচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছে টিআইবি।
তবে টিআইবি মনে করে, সরকারের কিছু পদক্ষেপ ও উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বক্তব্য বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের প্রকৃত অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টিকে আইনে পরিণত করার উদ্যোগ ইতিবাচক। কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন বাতিল বা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে পেছনের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব শক্তিশালী করে এমন বেশ কয়েকটি আইন অনুমোদন পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সুরক্ষা ও তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতকরণে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা দৃশ্যমান। পুলিশ, প্রশাসন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগও রয়েছে, যা নির্বাচনি অঙ্গীকারের পরিপন্থি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং চাঁদাবাজি দমনের ঘোষণা সত্ত্বেও হাট-বাজার, পরিবহন খাত, বাস ও ট্রাকস্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ অব্যাহত রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও রয়েছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর সহিংসতা এবং মুক্তচিন্তাবিরোধী কর্মকা-ের ধারাবাহিকতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও খাতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও সুশাসনের ঘাটতি, দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থানের অভাব, অব্যবস্থাপনা ও দলীয় প্রভাব কার্যক্রম বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়নে টিআইবি বলেছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিন একদিকে আশাজাগানিয়া ও সম্ভাবনাময় হলেও অন্যদিকে পরিবর্তনের উদ্যোগগুলো অনেক ক্ষেত্রে খ-িত ও তাৎক্ষণিকধর্মী। ফলে সুশাসন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন