সারা দেশে প্রায় ৩ কোটি খুচরা দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যারা গ্রামের হাটবাজার বা শহরের বিভিন্ন মহাজনের কাছ থেকে মালামাল এনে খুচরা পর্যায়ে পণ্য বিক্রি করেন। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাদেরও করের আওতায় আনার চেষ্টা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
আগামী ৫ বছরের জন্য প্রগতিশীল করকাঠামোর প্রস্তাব করা হবে। সে হিসেবে তাদের ০.২০ শতাংশ হারে অর্থাৎ প্রতি হাজারে রাজস্ব দিতে হবে মাত্র ২ টাকা। অতিরিক্ত কর দেওয়া হলে তা ফেরত পাবেন আয়করদাতা। তবে ৩ কোটি বিক্রেতার কাছ থেকে কী পরিমাণ রাজস্ব আদায় হবে, তা জানা যায়নি।
জাতীয় সংসদে আগামী ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) পরিকল্পনা ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বাজেট প্রস্তাবনা তুলে ধরবেন। তবে এবারের বাজেটে সরকারে লক্ষ্যÑ কর বৃদ্ধি নয়, বরং করের ভিত্তি সম্প্রসারণ।
সরকারের এমন বাজেট প্রস্তাবনার বিষয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ‘এতে সামগ্রিক রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে, তবে সরকারের পরিচালন ব্যয় আরও বাড়বে। প্রান্তিক পর্যায়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতে পারে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরও চাপে ফেলবে। এতে ইনকাম ট্যাক্সভীতি আরও বাড়তে পারে।’
সুপারিশ হিসেবে বলেন, ‘ট্রায়াল অ্যান্ড কন্ট্রোল’ পলিসিরি ভিত্তিতে একটি প্রকল্প হাতে নিয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় করা যেতে পারে। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সারা দেশে করা হলে সুফল আসবে। তার আগে প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হলে এমনিতেই ইনকাম ট্যাক্সভীতি রয়েছে, পরে তা প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এই ভীতি ছড়িয়ে যাবে।’
সরকারের প্রস্তাবনায় থাকছে, খুচরা বিক্রেতাদের ওপর আরোপিত আয়কর সমন্বয় করার সুযোগ পাবেন করদাতারা। অর্থাৎ অগ্রিম হিসেবে অতিরিক্ত কর কর্তন করা হলে করদাতা রিটার্ন জমা দেওয়ার পর অতিরিক্ত হিসেবে কেটে নেওয়া কর ফেরত পাবেন।
একই সঙ্গে করজাল সৃষ্টিতে আরও পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। আগামী অর্থবছর থেকে ব্যাংকের হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টেক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বারের (টিআইএন) বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হবে। সেন্ট্রাল ডাটা ইন্ট্রিগ্রেশনের মাধ্যমে এনবিআরের তথ্যভা-ারের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ, ব্যাংকিং, পরিষেবা, সাবরেজিস্ট্রি অফিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করে তথ্যের আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করার মতো প্রস্তাব থাকছে।
এসব প্রস্তাব কার্যকর হলে ব্যাংকিং লেনদেন ও পরিষেবা গ্রহণের তথ্য এনবিআর যাচাই করার সুযোগ পাবে। ফলে করজালের বিস্তৃতির পাশাপাশি করফাঁকি প্রবণতা কমে আসবে।
এদিকে, আগামী বাজেটে মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের দাম কমাতে চায় সরকার। ভোগ্যপণ্য হিসেবে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর থেকে উৎসে করের হার কমানো হবে। করের হার কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকছে আগামী বাজেটে। বর্তমানে এসব খাতে ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ হারে অগ্রিম কর প্রযোজ্য রয়েছে। অগ্রিম আয়কর কমানোর ফলে দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি কমবে এবং পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চায় সরকার।
উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করা : উৎসে করকে এত দিন বাধ্যতামূলক ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এতে অতিরিক্ত কর কেটে নেওয়া হলেও ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে ব্যবসায়ীদের পুঁজির সংকট হতো। আগামী অর্থবছরে উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব থাকছে। ফলে উৎসে করের মাধ্যমে পরিশোধিত অতিরিক্ত কর ফেরত পাবে আয়করদাতা। এর মাধ্যমে দেশীয় ব্যবসার সহজ পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যক্তির আয়করমুক্ত সীমা : আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়ের ক্ষেত্রে আগামী পাঁচ অর্থবছরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। এতে আগামী দুই অর্থবছরে (২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮) ব্যক্তির আয়করমুক্ত সীমা থাকবে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। পরবর্তী দুই অর্থবছরে (২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০) করমুক্ত আয়সীমা হবে ৪ লাখ টাকা এবং পরবর্তী অর্থবছরে আয়করমুক্ত সীমা হবে সাড়ে ৪ লাখ টাকা। তবে নারী করদাতা ও ৬৫ বছর বয়সি সিনিয়র সিটিজেনের জন্য আয়করমুক্ত সীমা আরও অতিরিক্ত হিসেবে ৫০ হাজার টাকা, তৃতীয় লিঙ্গের জন্য আরও ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাইযোদ্ধার জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা-মাতা বা আইনানুগ অভিভাবক প্রত্যেক প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে আয়মুক্ত সীমা উপভোগ করবেন।
এদিকে ২০২৮-২৯, ২০২৯-৩০ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ করের হার ৩৫ শতাংশ করার প্রস্তাব থাকছে। ৩ কোটি টাকার বেশি অবশিষ্ট মোট আয়ের ওপর এ কর আরোপ করা হবে। বর্তমানে ২ কোটি টাকার বেশি আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ আয়কর দিতে হয়।
দেশে প্রায় ৩ কোটি খুচরা দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। নতুন করারোপের বিষয়ে ভ্যাট কনসালট্যান্টস্ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও আয়কর আইনজীবী মো. হাসানুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিক্রির ওপর প্রতি হাজারে ২ টাকা অগ্রিম ট্যাক্স, মানে ০.২ শতাংশ এআইটি। আগে অনেক ছোট ব্যবসায়ী ট্যাক্সের বাইরে ছিল, এখন অটো কেটে নিলে সবাই সিস্টেমে ঢুকবে, এটি ভালো উদ্যোগ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্রেতার পকেটে চাপ পড়তে পারে। কারণ বিক্রেতারা ছোট ব্যবসায়ী। তাদেও লেনদেনের খাতাও ঠিকমতো নাই। দোকানদার ২ টাকা লস পোষাতে ১০০০ টাকার পণ্য ১০০২ টাকা রাখতে চাইবে। শেষে ক্রেতার পকেটে চাপ বাড়তে পারে।’
কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, উৎস পর্যায়ে কর সংগ্রহের এই পদ্ধতি জাতীয় কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তার ভাষায়, খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্রয়ের তথ্য নথিভুক্ত হওয়ার ফলে তাদের প্রকৃত আয় সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে।
একই সঙ্গে বড় করপোরেট সুপারশপ ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মধ্যে কর-অনুবর্তিতার (ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স) ক্ষেত্রে বিদ্যমান বৈষম্যও কিছুটা কমবে। তিনি আরও বলেন, ‘এই তথ্যভা-ার ভ্যাট প্রশাসনের জন্যও সহায়ক হবে। কারণ এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুচরা ব্যবসাগুলোকে ভ্যাট নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত করার পথ সহজ হবে এবং সামগ্রিক রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে।’
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, করের বোঝা যদি শেষ পর্যন্ত উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে, তাহলে তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের মূল্যে যোগ হয়ে ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন