যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা গত মে মাসে ৬৪ কোটি ৩৬ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন; যা অন্য যেকোনো দেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো মাসেই যুক্তরাজ্য থেকে এত বেশি রেমিট্যান্স আসেনি। ইউরোপের এই দেশ থেকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ গত কয়েক মাস ধরেই বাড়ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসত সৌদি আরব থেকে। মে মাসে সৌদিকে পেছনে ফেলে শীর্ষে উঠে এসেছে যুক্তরাজ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক রেমিট্যান্স প্রবাহের দেশভিত্তিক যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, মে মাসে মোট ৩৪২ কোটি ৫০ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অংক গত বছরের মে মাসের চেয়ে ১৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। একক মাসের হিসাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে মে মাসে। এর আগে সবচেয়ে বেশি ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ডলার এসেছিল চলছি বছরের মার্চ মাসে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে এমন ১০টি উৎস দেশের মধ্যে মে মাসে নয়টি থেকেই আয় বেড়েছে; কমেছে কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে (জুলাই-মে) সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি ৫২৮ কোটি ২২ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৬৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে।
দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। বলা যায়, সংকটে পড়া বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে রেমিট্যান্স। তবে প্রবাসী আয়ের উৎসে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে, এবার সেখানে ধস নেমেছে।
সৌদি আরবকে পেছনে ফলে গত দুই অর্থবছরে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছিল। এই দুই দেশকে ডিঙিয়ে আবার সেই সৌদি থেকে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসছে; দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছে যুক্তরাজ্য। শীর্ষ থেকে পাঁচে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র; আরব আমিরাত তৃতীয় স্থানে। চমক দেখিয়ে মালয়েশিয়া চলে এসেছে চতুর্থ স্থানে।
রেমিট্যান্সের উৎসে এই উত্থান-পতনের সুনির্দিষ্ট কারণ বলতে পারছেন না কেউ। কেন এক বছর এক দেশ থেকে বেশি আসছে, পরের বছরই ধস নামছে। অন্য দেশ শীর্ষে চলে আসছেÑ এর প্রকৃত কারণ বাংলাদেশ ব্যাংককে ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে বলেছেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, টানা ৬ মাস ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য খুবই ভালো। কিন্তু এই রেমিট্যান্সের উৎস দেশের ওঠানামা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। গত কয়েক বছর ধরে এক দেশ হঠাৎ করে শীর্ষে চলে আসছে, পরের বছর আবার নিচে নেমে যাচ্ছে। এটা কেন হচ্ছেÑ আমি বুঝতে পারছি না। সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী থাকেন। সেখান থেকে এবার বেশি রেমিট্যান্স আসছেÑ এটা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু যুক্তরাজ্য থেকে হঠাৎ বাড়ল কেন, তার কোনো সদুত্তর কিন্তু আমি পাচ্ছি না। সে কারণেই আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনুরোধ করবÑ রেমিট্যান্সের উৎস দেশে ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে প্রকৃত কারণ বের করতে। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এক্ষেত্রে অন্য কোনো কারণ আছে কি-না, পাচার হওয়া টাকা রেমিট্যান্স হয়ে দেশে আসছে কি নাÑ সবকিছু ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে উপসাগরীয় ছয় দেশের মধ্যে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ, আরব আমিরাতে ১০ লাখ, ওমানে ৭ লাখ, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজার, বাহরাইনে ১ লাখ ৫০ হাজার এবং কুয়েতে ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ৮ লাখের মতো এবং যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত প্রবাসীর সংখ্যা ১০ লাখের মতো। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশির সংখ্যা ৫ লাখের বেশি।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে সরাসরি ব্যাংক কিংবা এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে দেশে আসে। এক্সচেঞ্জ হাউসের সংগ্রহ করা রেমিট্যান্স ব্যাংকগুলো কিনে নিয়ে সুবিধাভোগীকে টাকা পরিশোধ করে। দেশের মোট রেমিট্যান্সের বেশি অংশ আসে এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে। যেসব দেশের এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স বেশি আসে, সেগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব আমিরাতে নিবন্ধিত কোম্পানি বেশি। ফলে প্রবাসীরা কোন দেশ থেকে অর্থ পাঠাচ্ছেন, তা না দেখিয়ে এক্সচেঞ্জ হাউসের নিবন্ধিত দেশ থেকে দেখানো হচ্ছিল। এ কারণে সৌদি আরব থেকে পাঠানো অর্থও যুক্তরাষ্ট্র ও আমিরাতের নামে আসত।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন