আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কিডনি, যা রক্ত পরিশোধনের পাশাপাশি বিভিন্ন বর্জ্য নিষ্কাশনে প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে কিডনির রোগকে চিকিৎসকেরা বলেন ‘নীরব ঘাতক’, কারণ অনেক সময় কোনো বড় ধরনের লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। অথচ একটু সচেতনতা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
আমাদের দৈনন্দিন খাবারের ওপর ‘রেনাল লোড’ বা কিডনির কাজের চাপ অনেকাংশে নির্ভর করে। আমরা যা খাই, তা থেকে শরীরে ইউরিয়া, সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো বিভিন্ন বর্জ্য তৈরি হয়। এই বর্জ্যগুলো ছাঁকার জন্য কিডনিকে প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয়, যা রেনাল লোড নামে পরিচিত। প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত প্রোটিন, লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খেলে এই চাপ বহুগুণ বেড়ে যায় এবং একপর্যায়ে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কিডনি সুরক্ষিত রাখতে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণের ভূমিকা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।
কিডনি ভালো রাখার জন্য প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো, শরীর ও আবহাওয়া অনুযায়ী প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা। সাধারণত দৈনিক ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি পানের পরামর্শ দেওয়া হয়, যা প্রস্রাবের রং হালকা স্বচ্ছ রাখার মাধ্যমে পানির সঠিক মাত্রা নির্দেশ করে। এর পাশাপাশি খাবারে লবণের পরিমাণ কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। দৈনিক সর্বোচ্চ এক চা-চামচ লবণ রান্নায় ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে কাঁচা বা ভাজা লবণ পুরোপুরি পরিহার করতে হবে। অতিরিক্ত লবণ কিডনি ও উচ্চ রক্তচাপের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। চিপস, ফাস্টফুড কিংবা ক্যানজাত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলাই শ্রেয়, কারণ এগুলোয় প্রচুর পরিমাণে লবণ ও রাসায়নিক থাকে।
খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল এবং শরীরের ওজন অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে প্রোটিন রাখা উচিত। বিশেষ করে লাল মাংস বা রেড মিট যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা ভালো। এ ছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যখন-তখন ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া, ধূমপান এবং অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস কিডনির রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়, যা অঙ্গটির স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করা উচিত, যা রক্তচাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ যেহেতু কিডনি রোগের প্রধান কারণ, তাই এগুলো সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা জরুরি, যাতে যেকোনো সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়ে।
সাধারণত প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগের স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। তবে শরীর বা মুখ-পা ফুলে যাওয়া, প্রস্রাবের বেগ ও পরিমাণে পরিবর্তন আসা, প্রস্রাবে ফেনা বা রক্তপাত হওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা এবং ক্ষুধামন্দার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। যেহেতু কিডনির রোগ হঠাৎ করে হয় না, বরং ধীরে ধীরে বাড়ে, তাই সঠিক সময়ে সচেতন হলে বড় ধরনের স্বাস্থ্য জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন