ডিজিটাল দুনিয়ায় ভালোবাসার মানুষ খোঁজার প্রক্রিয়াটি এখন অনেকের জন্যই এক ক্লান্তিকর চক্রে পরিণত হয়েছে। অ্যাপ ডাউনলোড করা, কিছুদিন ব্যবহার করে হতাশ হয়ে ডিলিট করা এবং একাকিত্ব কাটাতে আবার তা রি-ডাউনলোড করাÑ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারী এখন এই চক্রে বন্দি। গবেষকেরা একে বলছেন ‘ডেটিং অ্যাপ বার্নআউট’ বা ডেটিং অ্যাপজনিত চরম মানসিক ক্লান্তি।
বিজ্ঞান বলছে, এই অ্যাপগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মনে এমন একধরনের অবসাদ তৈরি করছে, যা মূলত অতিরিক্ত চাপের কোনো চাকরির ক্ষেত্রে দেখা যায়। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ মানসিক ক্লান্তি, মানুষের প্রতি একধরনের উদাসীনতা বা অবিশ্বাস এবং নিজের যোগ্যতা নিয়ে সংশয়। অনেকেই ভাবেন, সমস্যাটি হয়তো তাদের নিজেদের; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অ্যাপগুলোর অ্যালগরিদম ও গঠনগত প্রক্রিয়াই ব্যবহারকারীদের এই চক্রে আটকে রাখছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ডেটিং অ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিষণœতা, উদ্বেগ এবং একাকিত্বের হার সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে যারা আগে থেকেই কিছুটা মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তারা এই অ্যাপগুলোর কারণে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাপগুলোর বাণিজ্যিক লক্ষ্য আর ব্যবহারকারীদের বাস্তব জীবনের লক্ষ্যের মধ্যে একটি বড় অমিল রয়েছে। অ্যাপগুলো যদি সবাইকে দ্রুত সঠিক সঙ্গী খুঁজে দেয়, তাহলে তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে ব্যবহারকারীরা যাতে বারবার অ্যাপে ফিরে আসেন, সেভাবেই এগুলো ডিজাইন করা।
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে একের পর এক মুখ সোয়াইপ (ডানে-বামে সরানো) করার এই পদ্ধতি অনেকটা জুয়ার মতো কাজ করে। সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত তা মানুষকে ভেতরে ভেতরে শূন্য করে দেয়। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত শত শত প্রোফাইল দেখার সুযোগ থাকায় অবচেতনভাবেই মানুষ ডেটিংকে একটি বাড়তি কাজের মতো মনে করতে শুরু করে।
তবে এই মানসিক ক্লান্তি থেকে মুক্তির কিছু উপায় জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সেগুলো হলোÑ ডেটিং অ্যাপকে সঙ্গী খোঁজার একমাত্র মাধ্যম না বানিয়ে বাস্তবজীবনে মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ তৈরি করা। সময় নির্ধারণ করে সচেতনভাবে অ্যাপ ব্যবহার করা, যাতে তা আসক্তিতে রূপ না নেয়। এই প্রক্রিয়ার ভালো-মন্দ অভিজ্ঞতা বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করা, যা একাকিত্ব দূর করতে সাহায্য করে। অ্যাপ ব্যবহার যদি আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, তাহলে সাময়িকভাবে একেবারেই বিরতি নেওয়া।
বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই ‘সোয়াইপ ক্লান্তি’ বা অ্যাপের প্রতি অনীহা বাড়ায় ডেটিং অ্যাপ কোম্পানিগুলোও তাদের ব্যাবসায়িক মন্দা টের পাচ্ছে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আরও নিখুঁত ম্যাচিং এবং সরাসরি অফলাইন ইভেন্টের দিকে ঝুঁকছে তারা। তবে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের মাঝে নিজের মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার দায়িত্ব ব্যবহারকারীদের নিজেদেরই নিতে হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন