জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা। একদিকে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেশের অর্থনীতি, কৃষি, পরিবেশ এবং জনজীবনের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান এক শতাংশেরও কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ সবসময়ই শীর্ষ সারিতে অবস্থান করছে। এই কঠিন বাস্তবতায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী, দূরদর্শী এবং সাহসী উদ্যোগ।
বিশ্বব্যাপী পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণ সবচেয়ে কার্যকর, সহজলভ্য এবং স্বল্প ব্যয়বহুল উপায়গুলোর একটি। গাছ শুধু কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে না; এটি বায়ুম-লের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা করে এবং মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করে। একটি পরিণত গাছ বছরে গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি পর্যন্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সেই হিসাবে ২৫ কোটি গাছ পরিণত হলে প্রতিবছর কয়েক মিলিয়ন টন কার্বন শোষণের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে, যা বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ বনাঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হলেও কার্যকর বনভূমির পরিমাণ আরও কম। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী একটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য মোট ভূমির অন্তত ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনো কাক্সিক্ষত অবস্থান থেকে অনেক দূরে। ফলে বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুধু একটি পরিবেশগত উদ্যোগ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জাতীয় প্রয়োজন।
সরকারের ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রথম ধাপেই দেশের ৪৯টি জেলার ১৪৯টি উপজেলায় দেড় কোটি চারা রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচিতে বনজ, ফলদ ও ঔষধিÑ তিন ধরনের দেশীয় গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। কারণ অতীতে অনেক সময় দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশি প্রজাতির গাছ লাগানো হলেও সেগুলো পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় কাক্সিক্ষত অবদান রাখতে পারেনি। দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অধিক কার্যকর এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলোÑ উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলো ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উপকূলকে প্রাকৃতিক ঢালের মতো সুরক্ষা দেয়। উপকূলজুড়ে নতুন ম্যানগ্রোভ বন সৃষ্টি হলে তা শুধু দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাবে না, বরং কার্বন সংরক্ষণ, মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট সুবিধা অর্জনের সুযোগও তৈরি করবে।
এ কর্মসূচির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ বিদ্যালয় পর্যায়ে ‘এক শিশু, এক গাছ’ উদ্যোগ। পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা বাস্তব জীবনের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। একটি শিশু যখন নিজ হাতে একটি গাছ রোপণ করে এবং সেটির পরিচর্যা করে বড় হতে দেখে, তখন তার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবেশ সচেতন নাগরিক গঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না; গাছ বাঁচানো আরও বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে অতীতের অনেক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পর্যাপ্ত পরিচর্যা ও নজরদারির অভাবে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, রোপণকৃত চারার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই মারা যায়। ফলে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর চেয়ে ২৫ কোটি গাছকে বাঁচিয়ে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এখানে বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। ‘মিশন গ্রিন বাংলাদেশ’, ‘মাস্তুল ফাউন্ডেশন’, ‘বন্ধু ফাউন্ডেশন’-সহ বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে এসব সংগঠনের সমন্বয় ঘটানো গেলে কর্মসূচির কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ বহু আন্তর্জাতিক প্রশংসা অর্জন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেবল আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য দিয়ে বা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ও টেকসই পদক্ষেপ। ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সেই ধরনের একটি বাস্তবধর্মী উদ্যোগ, যা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আজ যখন পৃথিবী ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে, তখন প্রতিটি গাছ একটি জীবন্ত প্রতিরোধক, প্রতিটি বন একটি প্রাকৃতিক দুর্গ এবং প্রতিটি চারা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক। তাই ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এই জাতীয় কর্মসূচিকে কেবল সরকারের প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি হওয়া উচিত একটি গণআন্দোলন। রাষ্ট্র, সমাজ এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি প্রতিটি রোপিত চারা একদিন পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষে পরিণত হয়, তবে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর সামনে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে। সবুজ বাংলাদেশই হতে পারে নিরাপদ বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন