× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শিক্ষার্থী, বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৬, ০৬:৩২ এএম

শিশু পুষ্টির নীরব বিপর্যয়

শিক্ষার্থী, বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৬, ০৬:৩২ এএম

শিশু পুষ্টির নীরব বিপর্যয়

একটি জাতির উন্নয়ন কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত অবকাঠামোর মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না; বরং সেই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে তার মানবসম্পদের গুণগত মানের ওপর। আর মানবসম্পদের সেই ভিত্তি গড়ে ওঠে শৈশবে। তাই শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করা একটি রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশে হাজারো শিশু এখনো পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব নিয়েই বেড়ে উঠছে। অপুষ্টি একটি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মেধার বিকাশ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে এটি কেবল স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়; বরং জাতীয় উন্নয়নেরও একটি বড় অন্তরায়। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এসব সাফল্যের উল্টো দিকে শিশু সুষম বা সঠিক পুষ্টির বাস্তবতা এখনো উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)) ও ইউনিসেফ পরিচালিত (এমআইসিএস) ২০২৫-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের ২৪ শতাংশ খর্বাকৃতির এবং ১২.৯ শতাংশ ক্ষয়প্রাপ্ত। একই জরিপে আরও উঠে এসেছে, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সি প্রায় ৬৫ শতাংশ শিশু খাদ্যদারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে; অর্থাৎ তারা প্রতিদিন সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য পাচ্ছে না।

এই চিত্র ভাবায়, অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও মানসম্মত পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো আমাদের বড় ঘাটতি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের প্রায় ৪৫ শতাংশ মৃত্যুর সঙ্গে অপুষ্টি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। অর্থাৎ অপুষ্টি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও। গর্ভধারণ থেকে শুরু করে দুই বছর বয়স পর্যন্ত, শিশুর মস্তিষ্ক ও শরীরের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে পুষ্টির ঘাটতি হলে তার প্রভাব পরবর্তী জীবনে পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো, প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ এবং এরপর বয়সোপযোগী সম্পূরক খাদ্য নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। পুষ্টি মানে শুধু ক্যালোরি নয়; বরং প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন, ভিটামিনসহ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি উপাদানের সুষম উপস্থিতি। অনেক শিশু নিয়মিত খাবার খেলেও এসব উপাদানের অভাবে অপুষ্টির শিকার হয়।

এই অপুষ্টি সহজে চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু শিশুর মেধা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয়। শিশু অপুষ্টির জন্য শুধু দারিদ্র্যতাকে দায়ী করলে বাস্তব সমাধান মিলে না। সচেতনতার অভাব, মাতৃস্বাস্থ্যের দুর্বলতা, নিরাপদ খাদ্যের সীমিত প্রাপ্যতা, খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী মূল্য, স্বাস্থ্যসেবার অসম প্রাপ্যতা এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, সব মিলিয়ে পরিস্থিতিকে করেছে জটিল। অনেক পরিবারে শিশুর খাদ্যতালিকায় মাছ, ডিম, দুধ, ডাল, শাক-সবজি ও ফলের পরিবর্তে কম পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবার স্থান পাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্যের সহজলভ্যতা। এসব খাবার সাময়িকভাবে ক্ষুধা মেটালেও শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে না; বরং ভবিষ্যতে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। মায়ের পুষ্টি ও শিশুর পুষ্টি একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

অপুষ্ট মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশুর কম ওজন নিয়ে জন্মানোর ঝুঁকি বেশি থাকে। ফলে গর্ভকালীন সুষম খাদ্য, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত না করে শিশু অপুষ্টিজনিত ঘাটতি দূর করা সম্ভব নয়। শিশুর সুস্থ জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে মায়ের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই। অপুষ্টির প্রভাব কেবল শিশুর শারীরিক বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি তার শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং একটি দেশের অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। সুস্থ ও পুষ্টিমানসম্পন্ন শিশুই আগামী দিনের দক্ষ কর্মশক্তি, উদ্ভাবক ও নেতৃত্ব গড়ে তোলে। বর্তমান সময়ে শিশু পুষ্টির জন্য নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাড়ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।

অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য মাছ, ডিম, দুধ, ফল কিংবা পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অপেক্ষাকৃত সস্তা কিন্তু কম পুষ্টিমানসম্পন্ন খাবারের ওপর নির্ভর করছে। ফলে শিশুদের খাদ্যতালিকায় অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশ সরকার শিশু পুষ্টি উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি, ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন, কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মাতৃ ও শিশুসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

তবে এসব উদ্যোগের সুফল সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে হলে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে, পুষ্টিবিষয়ক শিক্ষা আরও বিস্তৃত করতে হবে এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এই সংকট মোকাবিলায় পরিবারকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুর জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ, এরপর বয়সোপযোগী সম্পূরক খাদ্য, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব। একই সঙ্গে শিশুর খাদ্যতালিকায় স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য পুষ্টিকর খাবারÑ ডিম, মাছ, ডাল, শাক-সবজি, ফল ও দুধ ইত্যাদি পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

পুষ্টিকর খাবার মানেই যে ব্যয়বহুল খাবার, এই ধারণাও ভাঙতে হবে। শিশু পুষ্টি নিয়ে নিয়মিত জনসচেতনতামূলক প্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং বৈজ্ঞানিক খাদ্যাভ্যাস প্রচারের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। একইভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পুষ্টিবিষয়ক পাঠ ও সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো গেলে শিশুদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে উঠবে। শিশু পুষ্টির এই নীরব বিপর্যয় রোধে তাই এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এটি কেবল একটি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব নয়, জাতীয় স্বার্থে এটি আবশ্যিক কর্ম।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!