কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিশ্বে এতদিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্যই ছিল সবচেয়ে বেশি। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, গুগল এবং মেটার মতো কোম্পানিগুলো নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। তবে সেই প্রতিযোগিতায় ইউরোপ থেকেও দ্রুত উঠে এসেছে একটি নাম মিস্ট্রাল এআই। অনেকেই প্রতিষ্ঠানটিকে ‘ইউরোপের ওপেনএআই’ বলে অভিহিত করলেও বাস্তবে তাদের লক্ষ্য ও ব্যবসায়িক কৌশল অনেকটাই ভিন্ন। মিস্ট্রাল শুধু একটি চ্যাটবট নির্মাতা নয়; বরং সরকার, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংস্থার জন্য নিরাপদ ও স্বনির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। ফ্রান্সের প্যারিসভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি এমন এক সময়ে আলোচনায় আসে, যখন ইউরোপে প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব বা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। বিশ্বের অনেক দেশ এখন এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চায়, যা কোনো একটি রাষ্ট্র বা বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। মিস্ট্রাল এআই সেই ধারণাকেই সামনে রেখে এগোচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবার জন্য উন্মুক্ত ও সহজলভ্য হওয়া উচিত এবং প্রতিটি দেশ ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আর্থার মেনশ, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা তিমোতে লাখোয়া এবং প্রধান বিজ্ঞান কর্মকর্তা গিয়োম লাম্পলÑ তিনজনই বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা নিয়ে মিস্ট্রাল এআই প্রতিষ্ঠা করেন। আর্থার মেনশ আগে গুগলের ডিপমাইন্ডে কাজ করেছেন, আর লাখোয়া ও লাম্পল ছিলেন মেটার গবেষক। সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে তারা ইউরোপের নিজস্ব শক্তিশালী এআই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
মিস্ট্রালকে অনেকেই শুধুমাত্র একটি চ্যাটবট কোম্পানি হিসেবে দেখলেও তাদের ব্যবসার মূল অংশটি ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য কাস্টম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল তৈরি করে। গ্রাহকদের নিজস্ব তথ্য ব্যবহার করে বিশেষায়িত এআই ব্যবস্থা তৈরি, সেটি তাদের নিজস্ব অবকাঠামোতে স্থাপন এবং নিরাপদভাবে পরিচালনার কাজও করে মিস্ট্রাল। তাদের ‘ফোর্জ’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের তথ্য ব্যবহার করে আলাদা এআই মডেল প্রশিক্ষণ দিতে পারে, যা সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রেও মিস্ট্রাল দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি শুধু বড় ভাষা মডেল নয়, মাল্টিমোডাল, যুক্তিনির্ভর, ভয়েস, অপটিক্যাল ক্যারেক্টার শনাক্তকরণ (ওসিআর) এবং ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ প্রযুক্তিও তৈরি করেছে। একই সঙ্গে স্মার্টফোন ও ছোট ডিভাইসের জন্য হালকা এআই মডেলও তৈরি করছে, যাতে সীমিত কম্পিউটিং শক্তিতেও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা সম্ভব হয়। তাদের কয়েকটি মডেল উন্মুক্ত হওয়ায় গবেষক ও সফটওয়্যার নির্মাতারাও সেগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারছেন।
ব্যবসায়িক সাফল্যের দিক থেকেও প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তাদের বার্ষিক পুনরাবৃত্ত আয় কয়েক কোটি ডলার থেকে কয়েকশ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্যও দ্রুত বেড়েছে এবং এটি এখন ইউরোপের সবচেয়ে মূল্যবান প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও মিস্ট্রালের ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব রয়েছে। মাইক্রোসফট তাদের এআই মডেল নিজেদের ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করেছে। এনভিডিয়া, আইবিএম, অ্যাকসেঞ্চার, এএসএমএল, স্টেলান্টিসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে মিস্ট্রাল। পাশাপাশি ফ্রান্সের সরকার, সেনাবাহিনী এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গেও তাদের সহযোগিতা রয়েছে। এসব অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তিকে শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব ব্যবহারের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে। মিস্ট্রালের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নিজস্ব অবকাঠামো গড়ে তোলা।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি এনভিডিয়ার চিপ ব্যবহার করলেও ভবিষ্যতে নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ তৈরির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি। তবে আপাতত তাদের মূল মনোযোগ উন্নত সফটওয়্যার, গবেষণা এবং অবকাঠামো নির্মাণে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মিস্ট্রাল এআই একাধিক বড় বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। ইউরোপের ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রাথমিক বিনিয়োগ পাওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে কয়েক বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। স্যামসাং ভেঞ্চার, লাইটস্পিড ভেঞ্চার পার্টনার্সসহ বিশ্বের শীর্ষ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন