সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে কোর্ট মার্শাল সম্পন্ন করার জন্য ঘাতক মোজাফফর হোসেনকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার মোহাম্মদ মোজাফফর হোসেন সে সময় ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন মেজর। হত্যাকা-ের পর তিনি পালিয়ে যান। তাকে ধরিয়ে দিতে সে-সময় পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। ডিএমপির গোয়েন্দা পুলিশপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন পলাতক থাকা মোজাফফর হোসেনকে পুলিশ হেফাজতে রেখে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে নিয়ম অনুযায়ী তার বাহিনীতে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খুনি মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘসময় ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন। অবশেষে ৪৫ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নির্মম হত্যাকা-ের শিকার হন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ঘটনার আগের দিন, অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ২৯ মে দুদিনের সফরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল নিজের প্রতিষ্ঠা করা রাজনৈতিক দল-বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার বিরোধ নিরসন করা।
চট্টগ্রামে পৌঁছে সফরের প্রথম দিনে নেতাকর্মীদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক শেষে মধ্যরাতে ঘুমাতে যান জিয়াউর রহমান। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেনাবাহিনীর একটি খুনিচক্র তার ওপর গুলি চালায় এবং ঘটনাস্থলেই সাবেক এই রাষ্ট্রপতি নিহত হন। পরবর্তীতে ৩০ মে সকালে রেডিওতে প্রথমবারের মতো জিয়াউর রহমানকে হত্যার খবর প্রচার করা হয়।
নির্মম এই হত্যাযজ্ঞে সরাসরি অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ঘাতক মেজর মোজাফফর হোসেন ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন ছিলেন অন্যতম। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও মামলা-সংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, মেজর মোজাফফর হোসেনই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান। হত্যাকা- নিশ্চিত করার পর তিনিই চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করে জানান, ‘দি প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড’।
জানা যায়, হত্যাকা-ের কয়েক ঘণ্টা পর জিয়ার লাশ গোপনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাহাড়ি এলাকায় তাকে কবর দেওয়া হয়। পরে সরকারের উদ্যোগে সেখান থেকে তার মরদেহ তুলে ঢাকায় এনে ২ জুন দাফন করা হয় সংসদ ভবনের পাশে। এদিকে রাষ্ট্রপতি শহিদ জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ঘাতকদল জিয়ার লাশও হস্তান্তর করতে রাজি হচ্ছিল না। ওই অবস্থায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরসহ হত্যাকারী সেনা সদস্যদের সবাইকে ৩১ মে দুপুর ১২টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন তখনকার সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, যিনি পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ খুনি চক্রের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সেদিন রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যান। পরদিন ১ জুন জিয়া হত্যাকা-ে জড়িত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুব চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সরকার সমর্থক সেনা সদস্যদের গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে প্রমাণ মিলে। মঞ্জুরকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ফের সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পায়।
মেজর জেনারেল মঞ্জুর ২ জুন ফটিকছড়ির একটি চা-বাগানে ধরা পড়েন। সেখান থেকে তাকে থানায় নেওয়া হয়। পরে রেডিও-টেলিভিশনে ঘোষিত সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম সেনানিবাসে একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যের হাতে জেনারেল মঞ্জুর নিহত হয়েছেন। সে-সময় হত্যাকা-ে ও বিদ্রোহে জড়িত ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করা হয়েছিল। তবে তখন খুনি মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এস এম খালেদ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তাদের দুজনকে ধরিয়ে দিতেও সে সময় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
অবশেষে সাড়ে চার দশক আত্মগোপনে থাকার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে আটক করতে সক্ষম হয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকা-ের একটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অধ্যায়ে নতুন অগ্রগতি এলো। সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচার প্রক্রিয়ার (কোর্ট মার্শাল) মাধ্যমে এখন তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন