দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মো. মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তার হয়েছেন। ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে তার গ্রেপ্তারের পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সেনা বিদ্রোহের অমীমাংসিত রহস্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এ বিষয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্যে বলা হয়েছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড, পরবর্তী সেনা বিদ্রোহ, মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের মৃত্যু এবং সে সময়ের রাজনৈতিক-সামরিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় ঘটনাগুলোর নেপথ্যের প্রকৃত চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
নথি অনুযায়ী, মেজর মো. মোজাফফর হোসেন ১৯৮১ সালের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বর্তমানে তিনিই একমাত্র জীবিত। দীর্ঘদিন পলাতক থাকায় তার বক্তব্য ও তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। তার সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন অমীমাংসিত দিক উন্মোচনের পাশাপাশি জাতির সামনে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে বিদ্যমান নথি ও প্রমাণের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়টি যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, মেজর মো. মোজাফফর হোসেন ১ম জিআরবিতে (জাতীয় রক্ষী বাহিনী) কমিশনপ্রাপ্ত ছিলেন। ১৯৮১ সালে তিনি ২৪ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতে অবস্থান করেন এবং সে সময় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার আশ্রয়ে ছিলেন বলে জানা যায়। ওই সময় তিনি ‘বিপ্লব সরকার’ ও ‘জয় ব্যানার্জি’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
১৯৮১ সালের সেনা বিদ্রোহ এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটনের লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই কমিটিতে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ডিজিএফআই, এনএসআই, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশ এবং প্রয়োজনে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া তদন্ত কার্যক্রম সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে পরিচালনার স্বার্থে মেজর মোজাফফর হোসেনকে ডিজিএফআই-এর জয়েন্ট ইন্টাররোগেশন সেন্টার (জেআইসি) অথবা সেনাবাহিনীর আর্মি ইন্টাররোগেশন সেল (এআইসি)-এ জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট তথ্য উদঘাটনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কর্তব্য সত্য অনুসন্ধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রতিহিংসার জন্য নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জাতীয় আস্থা পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্ভুল ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত। সত্য যাই হোক না কেন, তা জাতির জন্য বিভাজনের নয়; বরং শিক্ষা ও ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই কাম্য।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন