× UCB Sticker Card
শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৩:৫৫ এএম

আটলান্টায় অদম্য আর্জেন্টিনা

মির্জা হাসান মাহমুদ

প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২৬, ০৩:৫৫ এএম

আটলান্টায় অদম্য আর্জেন্টিনা

ফুটবলের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কিছু ম্যাচ শুধু কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; বরং তা রূপ নেয় শ্রেষ্ঠত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তার পরীক্ষায়। আটলান্টা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড ম্যাচে দর্শক প্রত্যক্ষ করেছে ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় প্রত্যাবর্তনের আখ্যান। বিরতির পর ৫৫ মিনিটে পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তের ঝড়ে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে পরাস্ত করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রেখেছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কোপা আমেরিকা জয়ী এই দলটির ফাইনাল নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক ফুটবলে অভূতপূর্ব এক মঞ্চ প্রস্তুত হয়েছে, যেখানে নিউ জার্সির ফাইনালে তাদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের ইউরো কাপের বর্তমান অধিপতি স্পেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দুই বর্তমান চ্যাম্পিয়ন শিরোপার চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে, আর্জেন্টিনার প্রায় আটানব্বই শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা স্প্যানিশ হওয়ার সুবাদে, এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সম্পূর্ণ স্প্যানিশ ভাষী দুটি দলের মধ্যকার দ্বিতীয় ফাইনাল, যার প্রথম নজিরটি দেখা গিয়েছিল আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে, ১৯৩০ সালের উদ্বোধনী আসরে উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার দ্বৈরথে। আটলান্টার এই জয় তাই কেবল আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার সুযোগই এনে দেয়নি, বরং ফুটবলীয় সংস্কৃতির সুপ্রাচীন বৃত্তকে সম্পূর্ণ করেছে।

ম্যাচের প্রথমার্ধের চিত্রনাট্যটি অবশ্য বিশুদ্ধ নান্দনিক ফুটবলের চেয়ে দুই দলের শারীরিক শক্তি, তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ এবং ফাউলের আধিক্য দিয়েই বেশি রচিত হয়েছিল। মাঠের ভেতরের আদিম ও রুক্ষ লড়াই দেখে গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের অনেকের মনেই হয়তো ছায়া ফেলেছিল দুই দেশের সুপ্রাচীন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বৈরিতার স্মৃতি। ম্যাচের শুরু থেকেই লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও জুড বেলিংহামের মধ্যকার শারীরিক সংঘর্ষ দুই দলের রণকৌশলের উগ্র রূপটি স্পষ্ট করে তোলে। মধ্যমাঠের দখল নেওয়ার লড়াইয়ে প্রথমার্ধে কোনো দলই প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে একটিও নিখুঁত শট রাখতে পারেনি। প্রথমার্ধের অন্তিম লগ্নে এলিয়ট অ্যান্ডারসন ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজের হলুদ কার্ড পাওয়ার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, কৌশলগত শৃঙ্খলার চেয়ে একে অপরকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়াই ছিল তখন প্রধান লক্ষ্য। এই বিশ্বকাপে মিশর ম্যাচ ব্যতীত প্রতিটি ম্যাচেই প্রথমার্ধে গোল করা আর্জেন্টিনা এবারই প্রথম বিরতিতে যায় গোলশূন্য সমতা নিয়ে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়।  ৫৫ মিনিটে মরগান রজার্সের নিখুঁত ক্রস থেকে চমৎকার গোল করে ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেন ফরোয়ার্ড অ্যান্থনি গর্ডন। ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখা ইংলিশ শিবির তখন উল্লাসে মত্ত। কিন্তু এই গোলের পরই শুরু হয় ম্যাচের কৌশলগত ট্র্যাজেডি। গোলটি হজম করার পর আর্জেন্টিনার কোচ যখন আক্রমণের তীব্রতা বাড়াতে খেলোয়াড়দের নির্দেশ দিচ্ছেন, ঠিক তখনই ইংল্যান্ডের ডাগআউটে ম্যানেজার টমাস টুখেল বেছে নেন চরম বিতর্কিত পথ। প্রথমার্ধের আক্রমণাত্মক রণকৌশল ত্যাগ করে ইংল্যান্ড হঠাৎ করেই ৫-৪-১ ফরমেশনের দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে তোলার চেষ্টা করে।

বেঞ্চ থেকে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ড্যান বার্নকে মাঠে নামিয়ে চারজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের সমন্বয়ে রক্ষণভাগকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়ার টুখেলের এই সিদ্ধান্তটিই শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এই অতিরক্ষণাত্মক কৌশলের ফলে ইংল্যান্ড কেবল নিজেদের লিড ধরে রাখার চেষ্টা করেনি, বরং আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগকে বারবার আক্রমণের উন্মুক্ত আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

পরিসংখ্যানের আলোকেই ইংল্যান্ডের এই কৌশলগত আত্মহননের চিত্রটি সবচেয়ে ভালো অনুধাবন করা সম্ভব। গর্ডনের গোলের পর থেকে পরবর্তী ৩১ মিনিট মাঠে একতরফা ফরাসি ধাঁচের আক্রমণ চালিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। এই দীর্ঘ সময়ে ইংল্যান্ডের বলের দখল ছিল মাত্র বারো শতাংশ। তারা আর্জেন্টিনার ডিফেন্সিভ থার্ডে তো দূর, পুরো ম্যাচে অ্যাটাকিং থার্ডেই বল স্পর্শ করতে পেরেছে মাত্র ৯ বার, যা আর্জেন্টিনার চেয়ে ১৬৫ বার কম। পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগ ইংল্যান্ডকে বলতে গেলে আর কোনো শটই নিতে দেয়নি। বিপরীতে, আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দুটি দুর্দান্ত শট পোস্টে লেগে ফিরে আসা এবং উইং ব্যবহার করে ইংলিশ ডিফেন্সের ফাঁকফোকর বের করার ধ্রুপদি লাতিন শৈলী ইংল্যান্ডের জন্য ছিল অমোঘ

সতর্কবার্তা। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড নিকো গনসালেসের হেডসহ বেশ কয়েকটি নিশ্চিত গোল প্রতিহত করে ব্যবধান ধরে রাখলেও, আর্জেন্টিনার  একের পর এক আক্রমণের ঢেউ ঠেকিয়ে রাখা তার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। চাপ সামলানোর এই ব্যাকরণহীন ফুটবল শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে ম্যাচের ৮৫ মিনিটে। ম্যাচের এই চূড়ান্ত ক্রান্তিলগ্নে আবারও ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন লিওনেল মেসি, যিনি ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিলেন। গোল না পেলেও পুরো ম্যাচজুড়ে ডান উইং ধরে তার ৯টি সফল ড্রিবলিং এবং নিখুঁত পাসিং প্রতিপক্ষের রক্ষণকে করে তুলেছিল দিশাহারা। ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের পরিসংখ্যান সংরক্ষণের ইতিহাস শুরুর পর প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের কোনো নকআউট ম্যাচে ৯টি সফল ড্রিবলের পাশাপাশি দুটি গোলের উৎস তৈরি করার অনন্য কীর্তি গড়েন এই কিংবদন্তি। ৮৫ মিনিটে একটি শর্ট কর্নার থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থাকা এনজো ফার্নান্দেজকে পাস দেন মেসি, এবং ফার্নান্দেজের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া দূরপাল্লার দুর্দান্ত শট পিকফোর্ডকে পরাস্ত করে জালে জড়ালে সমতায় ফেরে আর্জেন্টিনা। সমতা ফেরার পর ম্যাচের আসল নাটকীয়তা মঞ্চস্থ হয় রেফারি কর্তৃক নির্ধারিত ৯ মিনিটের যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে। নিজের তুলনামূলক দুর্বল ডান পা দিয়ে মেসির নেওয়া এক অলৌকিক ও নিখুঁত ক্রস যখন দূর পোস্টে ভেসে আসে, তখন বদলি হিসেবে নামা স্ট্রাইকার লাওতারো মার্তিনেজ দুর্দান্ত হেডে বল ইংল্যান্ডের জালে জড়িয়ে দেন। মাত্র সাত মিনিটের এই অভাবনীয় ঝড়ে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে ম্যাচটি নিজেদের পকেটে পুরে নেয় আর্জেন্টিনা।

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর আটলান্টার মাঠেই হাঁটু মুড়ে বসা লিওনেল মেসির আবেগঘন উদ্যাপন দীর্ঘকাল ফুটবল রোমান্টিকদের স্মৃতির মণিকোঠায় অক্ষত থাকবে। তবে এই ম্যাচের পর আর্জেন্টিনার চেয়েও বেশি চর্চিত হচ্ছে তাদের এই ম্যাচ শেষের অদম্য মানসিকতা। ম্যাচের ৭৫ মিনিট পার হওয়ার পর চলতি টুর্নামেন্টে এটি ছিল আর্জেন্টিনার ১১তম গোল। ম্যাচের শেষ কোয়ার্টারে এসে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে ক্লান্ত করে এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে গোল আদায় করে নেওয়াটা এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সিগনেচার মার্কে পরিণত হয়েছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছাড়ার চারিত্রিক দৃঢ়তাই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ফাইনালের মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে তারা ইতিহাসের তৃতীয় দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের সোনালি সুযোগের মুখোমুখি।

বিপরীতে, ইংল্যান্ডের জন্য এই পরাজয় কেবল আরও একটি সেমিফাইনাল থেকে বিদায়ের বেদনা নয়, বরং এটি তাদের ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর ক্ষতের জন্ম দিয়েছে। এর আগেও ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে কিংবা ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময়ের লড়াইয়ে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল ইংলিশদের। তবে ১৯৯০ সালে তারা ফেবারিটের তকমা ছাড়াই প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়েছিল এবং ২০১৮ সালেও প্রত্যাশাহীন এক দল নিয়ে সিংহভাগ সময় এগিয়ে থেকেও শেষ দিকে গোল হজম করেছিল। কিন্তু আটলান্টার এই রাতটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ১-০ গোলে এগিয়ে থাকা এবং ম্যাচের প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার চেয়ে শ্রেয়তর ফুটবল খেলার পরও কেবল অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক মানসিকতার কারণে তাদের ম্যাচটি হাতছাড়া করতে হয়েছে। হারের পর অধিনায়ক হ্যারি কেইনের কণ্ঠেও ঝরে পড়েছে সেই একই কৌশলগত ভুলের হতাশা।তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, এগিয়ে যাওয়ার পর কেবল লিড ধরে রাখার এই নিষ্ক্রিয় চেষ্টাই তাদের ধ্বংসের মূল কারণ ছিল, কারণ আধুনিক ফুটবলের সর্বোচ্চ স্তরে শুধু রক্ষণভাগ দিয়ে পুরো ম্যাচ পার পাওয়া অসম্ভব। টমাস টুখেলের এই অতিরক্ষণাত্মক দর্শন আগামী দিনগুলোতে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও ফুটবল বিশ্লেষকদের তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হবে তা বলাই বাহুল্য। আটলান্টায় রচিত এই ম্যাচ প্রমাণ করে, ফুটবল শেষ পর্যন্ত তাদেরই পুরস্কৃত করে যারা শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আক্রমণের সাহস বজায় রাখে, আর আর্জেন্টিনা সেই সাহসেরই অন্য নাম।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!