বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি স্পর্শ করার স্বপ্ন যখন সেমিফাইনালের বাস্তবতায় চূর্ণ হয়ে যায়, তখন ফুটবলারদের সামনে অপেক্ষা করে সান্ত¡না পুরস্কার জেতার সুযোগ। এমন সুযোগ সামনে রেখে শিরোপার সুউচ্চ মঞ্চ থেকে ছিটকে পড়ার বিষাদ বুকে চেপে, শনিবার মিয়ামির হার্ড
রক স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ফুটবলের দুই পরাশক্তি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স। সেমিফাইনালে স্পেনের কৌশলগত জালের কাছে ফ্রান্সের হার এবং অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে থেকেও আর্জেন্টিনার কাছে থ্রি লায়ন্সের ২-১ ব্যবধানের পরাজয় দুই দলকেই এনে দাঁড় করিয়েছে সমান্তরাল ট্র্যাজেডির মুখে। তবে স্বপ্নভঙ্গের এই বেদনার মাঝেও বিশ্বকাপের ব্রোঞ্জ পদক এবং মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের অদৃশ্য অহংকার এই ম্যাচটিকে করে তুলেছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের রুদ্ধশ্বাস কোয়ার্টার ফাইনালের পর এই প্রথম আবার বিশ্বমঞ্চে দেখা হচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর। মিয়ামির কৃত্রিম আলোর নিচে এটি তাই কেবল একটি সান্ত¡না পুরস্কারের লড়াই নয়, বরং ফরাসিদের জন্য আধুনিক ফুটবলে নিজেদের আধিপত্যের ধারা বজায় রাখার পরীক্ষা এবং ইংরেজদের জন্য কাতারের সেই ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ।
ইতিহাস ও বর্তমান
ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের খেরোখাতা উল্টালে দেখা যাবে, এই দুই দলের সামগ্রিক দ্বৈরথে ইংল্যান্ডের আধিপত্য বেশ স্পষ্ট। এ পর্যন্ত মুখোমুখি হওয়া ৩২টি ম্যাচের মধ্যে ১৭টিতেই শেষ হাসি হেসেছে থ্রি লায়ন্স, যেখানে ফ্রান্সের জয় মাত্র ১০টি ম্যাচে, বাকি ৫টি ম্যাচ শেষ হয়েছে অমীমাংসিত ড্রয়ে। তবে ইংরেজদের এই সংখ্যার গৌরব অনেকটাই বিশ্ব ফুটবলের শুরুর দিনগুলোর আদিম ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে, যার বড় প্রমাণ ১৯৫৭ সালের ৪-০ কিংবা ১৯৬৯ সালের ৫-০ গোলের সেই একতরফা জয়।
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ফুটবলের বাস্তবতা এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রবণতা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্পের অবতারণা করে। শেষ পাঁচটি আন্তর্জাতিক সাক্ষাতে ফ্রান্স তিনবার জিতেছে এবং মাত্র একবার পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছে। ইংরেজ ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতির মণিকোঠায় সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও ক্ষতবিক্ষত অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। সেই ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় শেষ মুহূর্তে হ্যারি কেইনের পেনাল্টি মিসের করুণ দৃশ্য আজও থ্রি লায়ন্স সমর্থকদের তাড়িয়ে বেড়ায়। দিদিয়ের দেশমের দল সেবার কেইনের মানবিক ভুলকে পুঁজি করেই সেমিফাইনালের টিকিট কেটেছিল। ফলে মিয়ামির এই পুনঃম্যাচটি থ্রি লায়ন্সের জন্য কেবল ব্রোঞ্জ পদকের নয়, বরং কাতারের সেই ঐতিহাসিক ঋণের হিসাব চুকানোর এক অগ্নিপরীক্ষা।
কৌশলগত অবস্থান
সেমিফাইনালে স্পেনের দুর্ভেদ্য রক্ষণ ও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণের কাছে ০-২ গোলে পরাস্ত হওয়া ফ্রান্সের জন্য এই ম্যাচটি তাদের আক্রমণাত্মক দর্শনে ফেরার বড় সুযোগ। টুর্নামেন্ট জুড়ে ১৬টি গোল করা বিধ্বংসী আক্রমণভাগ থাকা সত্ত্বেও সেমিফাইনালে লা রোজার জ্যামিতিক ফুটবলের কারণে দেশাম্পের রণকৌশল সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছিল। তবে ইংল্যান্ডের মতো প্রথাগত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলা দলের বিরুদ্ধে ফ্রান্স তাদের চিরচেনা ট্রানজিশনাল ফুটবল বা দ্রুত প্রতি-আক্রমণের কৌশল বেছে নেবে। মাইকেল ওলিসে, দেজিরে দুয়ে এবং ব্র্যাডলি বারকোলার মতো তরুণ ও গতিশীল উইঙ্গারদের পা দিয়ে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগের পেছনের শূন্যস্থান বা ফাঁকফোকর কাজে লাগাতে চাইবে লে ব্লুস। বড় ম্যাচের চাপ সামলানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ফরাসি শিবিরের অন্যতম বড় শক্তি। বিপরীতে, টমাস টুখেলের ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা তাদের এরিয়াল বল বা আকাশমার্গের যুদ্ধ এবং নিখুঁত সেট-পিস। হ্যারি কেইন এবং জুড বেলিংহ্যাম এরিয়াল ডুয়েলে অত্যন্ত পারদর্শী, যা ফ্রান্সের বক্সের ভেতর যেকোনো মুহূর্তে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে বেলিংহ্যামের দ্বিতীয় লাইন থেকে আচমকা প্রতিপক্ষের পেনাল্টি এরিয়ায় ঢুকে পড়ার প্রবণতা এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে, যা তাদের সেমিফাইনালের আগে ১৩টি গোল উপহার দিয়েছিল। ফ্রান্সের ডিফেন্স লাইন যদি বেলিংহ্যামের দৌড় থামাতে ব্যর্থ হয়, তবে মায়ামির রাতটি ইংরেজদের রঙে রাঙানো অসম্ভব কিছু নয়।
বেঞ্চের গভীরতা
এক মাসব্যাপী চলা এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর ফুটবল মহাযজ্ঞের শেষ প্রান্তে এসে উভয় দলই এখন কিছুটা খেলোয়াড় সংকটে ভুগছে। ফুটবলারদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি ডাগআউটের দুই ম্যানেজারের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ফরাসি শিবিরে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম কিলিয়ান এমবাপ্পে; গোড়ালির গুরুতর সমস্যার কারণে এই ফরাসি অধিনায়ককে এখনো চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কুঁচকির চোটের কারণে মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তি অরেলিয়েন চুয়ামেনির খেলার যোগ্যতাও চরম অনিশ্চয়তার মুখে। যদি এই দুই তারকা শতভাগ ফিটনেস ফিরে না পান, তবে ফ্রান্সের মাঝমাঠ ও আক্রমণের গুরুদায়িত্ব এসে পড়বে আদ্রিয়েন রাবিও এবং মানু কোনের মতো তরুণ প্রতিভাদের কাঁধে।
একই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে টমাস টুখেলের থ্রি লায়ন্স শিবিরও। মাঝমাঠের অভিজ্ঞ সেনানি জর্ডান হেন্ডারসনকে এই ম্যাচে নিশ্চিতভাবেই পাচ্ছে না ইংল্যান্ড। এর বাইরেও দলের তিন অপরিহার্য স্তম্ভ, রিস জেমস, ডেক্লান রাইস এবং মার্ক গেহির কুঁচকি ও মাংসপেশির চোট এতটাই গুরুতর যে, মাঠে নামানোর আগে তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খ ফিটনেস পরীক্ষার প্রয়োজন হবে। এই সৈন্য পরিস্থিতি অবশ্য টুখেলকে এক ধরনের সুযোগও করে দিচ্ছে; দলের খেলার ধরনে নতুনত্ব ও ক্ষিপ্রতা আনতে তিনি প্রথম একাদশে ফিল ফোডেন কিংবা সেমিফাইনালের গোলদাতা অ্যান্থনি গর্ডনকে শুরু থেকেই ব্যবহার করতে পারেন।
বেঞ্চের গভীরতা এবং রিজার্ভ বেঞ্চের তরুণদের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেবে মায়ামির এই ক্লান্তিকর যুদ্ধের শেষ হাসি কার মুখে ফুটবে।
আত্মসম্মানের লড়াই
ফুটবল ইতিহাসের পাতায় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে অনেক সময় এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বা গুরুত্বহীন লড়াই হিসেবে দেখার একটা প্রবণতা থাকে। কিন্তু যখন লড়াইটি ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মতো দুটি ফুটবল আভিজাত্যে ঠাসা পরাশক্তির মধ্যে হয়, তখন ম্যাচটি আর প্রীতি ম্যাচের পর্যায়ে থাকে না। কিলিয়ান এমবাপ্পের সামনে সুযোগ থাকবে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে নিজের আধিপত্যকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার, অন্যদিকে হ্যারি কেইনের সামনে সুযোগ থাকবে দেশবাসীকে আরও একটি বিশ্বকাপ পদক উপহার দিয়ে কাতার ট্র্যাজেডির খলনায়কের তকমা চিরতরে মুছে ফেলার। মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় যখন রেফারি ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজাবেন, তখন দুই দলের খেলোয়াড়দের ধমনীতে ফাইনালে না ওঠার বিষাদের চেয়েও বেশি কাজ করবে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার আদিম অহংকার। সোনালি ট্রফি না পাওয়ার শূন্যতা হয়তো পূরণ হবে না, তবে ব্রোঞ্জ পদকের এই ব্রোঞ্জের আবরণে লুকিয়ে থাকবে দুই দেশের ফুটবলীয় আত্মসম্মানের তীব্র লড়াই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন