× UCB Sticker Card
রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

মায়মুনা, শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০১:২৭ এএম

স্মৃতির পাতায় জুলাইয়ের রক্তঋণ

মায়মুনা, শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশিত: জুলাই ১৯, ২০২৬, ০১:২৭ এএম

স্মৃতির পাতায় জুলাইয়ের রক্তঋণ

কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মাস কোনটি? আমি নির্দ্বিধায় বলব, জুলাই। ক্যালেন্ডারের হিসাবে এটি মাত্র একত্রিশ দিনের একটি মাস, কিন্তু অনুভূতির হিসাবে যেন কয়েক যুগের সমান। এই এক মাসে আমি দেখেছি মানুষের সাহস, ভয়, কান্না, প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ এবং আশার এক বিরল সম্মিলন। দেখেছি কীভাবে একটি যৌক্তিক দাবি ধীরে ধীরে একটি জাতীয় আলোচনায়, তারপর এক বিস্তৃত গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সবকিছুর শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকে। তারা বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। শুরুতে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, কণ্ঠে ছিল স্লোগান, চোখে ছিল একটি ন্যায্য বাংলাদেশের স্বপ্ন।

তাদের বিশ্বাস ছিল, যুক্তির ভাষা রাষ্ট্র শুনবে। কিন্তু ইতিহাসের অনেক মোড়ের মতো এখানেও বাস্তবতা খুব দ্রুত বদলে যায়। উত্তেজনা বাড়তে থাকে, সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, আর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আহত ও নিহত হওয়ার খবর আসতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই রক্তাক্ত ছবি, হাসপাতালের করিডরে স্বজনের কান্না, নিখোঁজ সন্তানের খোঁজে বাবা-মায়ের আকুতি এসব দৃশ্য আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে অস্বাভাবিক করে তুলেছিল। তখন একটি প্রশ্নই বারবার ফিরে আসছিল একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের কণ্ঠ কি এমন পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার কথা? জুলাইয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু। তার মৃত্যু দেশজুড়ে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। এরপর উত্তরায় আহত শিক্ষার্থীদের জন্য পানি ও বিস্কুট নিয়ে যাওয়ার সময় নিহত হন মীর মুগ্ধ। মানবিকতার এই নির্মম পরিণতি হাজারো মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আরও হৃদয়বিদারক ছিল মাত্র চার বছর বয়সি আবদুল আহাদের মৃত্যু। একটি শিশুর প্রাণহানি পুরো জাতিকে নতুন করে প্রশ্ন করেছিল সহিংসতার শেষ সীমা কোথায়? দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ, আহত হওয়া এবং প্রাণহানির খবর আসতে থাকে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসকদের নিরলস চেষ্টা, রক্তদানের দীর্ঘ সারি এবং স্বেচ্ছাসেবকদের অক্লান্ত পরিশ্রম যেন একই সঙ্গে মৃত্যু ও জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।

আমি আজও ভুলতে পারি না সেই মায়েদের মুখ। যারা দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিলেন হয়তো এই বুঝি ছেলে ফিরে এলো। কিন্তু অনেক দরজা আর খোলেনি। অনেক ফোন আর বেজে ওঠেনি। অনেক স্বপ্ন সেদিন থেমে গিয়েছিল হাসপাতালের বিছানায় কিংবা নিস্তব্ধ কোনো কবরস্থানে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং দেশ ছেড়ে চলে যান। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। কেউ এই ঘটনাকে গণআন্দোলনের পরিণতি হিসেবে দেখেছেন, কেউ রাজনৈতিক সংকটের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি মোড়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বহু বছর ধরে বিশ্লেষণ করবে। আমার কাছে জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়।

আমার কাছে জুলাই মানে আবু সাঈদের সাহস, মীর মুগ্ধের মানবিকতা এবং ছোট্ট আবদুল আহাদের অসমাপ্ত শৈশব। আমি বিশ্বাস করি, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার ন্যায়বিচারে। জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের গল্প নয়; ইতিহাসে স্থান পায় সেই মায়ের নীরব কান্না, সেই বাবার দীর্ঘশ্বাস, সেই চিকিৎসকের ক্লান্ত চোখ, সেই রিকশাচালকের মানবিকতা এবং সেই অচেনা রক্তদাতার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। জুলাই শেষ হয়ে যায় ক্যালেন্ডারের পাতায়, কিন্তু তার রক্তঋণ শেষ হয় না জাতির বিবেক থেকে। সময়ের প্রবাহে ক্ষত হয়তো শুকিয়ে যায়, কিন্তু আত্মত্যাগের স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে থাকে কিছু অপ্রকাশিত কান্না, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন, কিছু নামহীন সাহসের গল্প। জুলাইও তেমনই এক অধ্যায় যেখানে প্রতিবাদের ভাষা, মানবিকতার পরীক্ষা এবং ন্যায়বিচারের আকাক্সক্ষা এক সঙ্গে ইতিহাস রচনা করেছে। হয়তো এক দিন নতুন প্রজন্ম জুলাইকে ইতিহাসের বইয়ে পড়বে। তারা পরিসংখ্যান জানবে, ঘটনাক্রম মুখস্থ করবে, বিভিন্ন বিশ্লেষণ পড়বে।

জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনে নির্মিত হয় না; তা নির্মিত হয় সত্যকে স্বীকার করার সাহসে, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সততায় এবং প্রতিটি মানুষের জীবনকে সমান মূল্য দেওয়ার সংস্কৃতিতে। তাই এই মাস শুধু স্মরণের নয়, আত্মসমালোচনারও।

জুলাইয়ের রক্তঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় প্রতিশোধ নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করা এবং এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের মর্যাদা হবে সর্বোচ্চ। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের নয়, সত্যের পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়। আর সেই সত্য আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় আত্মত্যাগ তখনই অর্থবহ হয়, যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার বিনিময়ে পায় আরও ন্যায়ভিত্তিক, আরও মানবিক এবং আরও গণতান্ত্রিক একটি বাংলাদেশ।

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!