বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি বৈচিত্র্যময়। পাহাড়, নদী, হাওর আর দীর্ঘ উপকূলরেখায় ঘেরা এই বদ্বীপের প্রতিবেশ ব্যবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপের মুখে পড়ে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অঞ্চল আজ হুমকির মুখে। এই নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী দেশের মোট ১৩টি এলাকাকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নেওয়া প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই উদ্যোগ এই এলাকাগুলোর সুরক্ষায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
ইসিএর পরিধি ও তালিকা : বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গুরুত্ব বিবেচনায় ঘোষিত ইসিএ তালিকাভুক্ত এলাকাগুলো হলোÑ সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, হাকালুকি হাওর, সোনাদিয়া দ্বীপ, টেকনাফ উপদ্বীপ, টাঙ্গুয়ার হাওর, মারজাত বাঁওড়, গুলশান-বারিধারা লেক, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা নদী এবং জাফলং-ডাউকি নদী। এই এলাকাগুলোকে স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্র হিসেবে টিকিয়ে রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
ইসিএর এলাকায় নিষিদ্ধ কার্যক্রম ও আইনি বাধ্যবাধকতা : ইসিএ এলাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে এমন যেকোনো কর্মকা- আইনত নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছেÑ যেকোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, জলাশয় ভরাট, প্রাকৃতিক বন উজাড়, বন্যপ্রাণী শিকার বা আবাসস্থল ধ্বংস, পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন এবং ক্ষতিকর বর্জ্য ও শিল্পকারখানার তরল বিষাক্ত পদার্থ উন্মুক্ত জলাশয়ে ফেলা। এই আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদ- বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দ-ের বিধান রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব অপরাধ দমনে কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে।
ইসিএ এলাকা ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম : ইসিএ ব্যবস্থাপনায় সরকার একটি বিকেন্দ্রীকৃত মডেল গ্রহণ করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে প্রতিটি ইসিএ-তে জনগণ, স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ‘ইসিএ ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।
জনঅংশগ্রহণ ও গ্রাম সংরক্ষণ দল : পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় জনমানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে হাকালুকি হাওর, কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ এবং সোনাদিয়া দ্বীপে মোট ৭৫টি ‘গ্রাম সংরক্ষণ দল’ গঠন করে সমবায় অধিদপ্তরে নিবন্ধিত করা হয়েছে। এর মধ্যে হাকালুকি হাওরে ২৮টি এবং কক্সবাজারে ৪৭টি দল সক্রিয় রয়েছে। মূলত এই দলগুলোর সদস্যদের মাধ্যমেই মাঠপর্যায়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ম্যানগ্রোভ বন সৃষ্টি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম : কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপ, সদর উপজেলার খুরুশকুল রাস্তারপাড়া ও নুনিয়াছড়া এবং টেকনাফ এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর ম্যানগ্রোভ বন (প্যারাবন) সৃষ্টি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। এই ম্যানগ্রোভ বনগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে জানমাল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া এই বনগুলো পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিকাশ, বিভিন্ন জলজ প্রাণীর নার্সারি হিসেবে কাজ করা এবং স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
জলজ বন সৃষ্টি ও সংরক্ষণ কার্যক্রম : হাকালুকি হাওরের প্রতিবেশ ব্যবস্থা উন্নয়নে জলজ বন সৃষ্টি ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা এই হাওরের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই বন মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর নার্সারি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে জলজ প্রাণীর আবাসস্থল এবং শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যা একই সাথে পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশেও সহায়ক। এছাড়া, হাওরের প্রতিবেশ ও মৎস্যসহ জলজ সম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বিল-খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পনেরোটি জলাভূমির অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা হাওরের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা : ইসিএ-ভুক্ত নদী ও হাওর এলাকায় মাছ ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজননের জন্য ‘অভয়াশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অভয়াশ্রমের নির্দিষ্ট সীমানায় সারা বছর বা নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ ধরা ও জাল ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মৎস্যজীবীদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ দিয়ে তাদের অভয়াশ্রম এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে হাওর ও নদীর বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার বহুগুণ বেড়েছে।
প্রযুক্তি ও টেকসই অবকাঠামো : ইসিএর প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় জনবসতির জীবনমান উন্নয়ন ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ। উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সৌরশক্তিচালিত পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে, যা মূলত স্থানীয় জনসাধারণের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।
উপকারভোগীদের অভিজ্ঞতা ও জীবনমান : সরকারের এসব উদ্যোগের প্রত্যক্ষ সুফল পাচ্ছেন প্রান্তিক মানুষ। হাকালুকি হাওরের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, আগে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে সেচ দিতে হিমশিম খেতে হতো। এখন সৌর পাম্পের কল্যাণে কম খরচে ফসল ফলাতে পারছি।’ একইভাবে সেন্টমার্টিনের নারীরা জানান, ‘আগে লোনা বা দূষিত পানির কারণে নানা রোগব্যাধি লেগেই থাকত। এখন সৌর প্ল্যান্টের মিষ্টি পানি আমাদের অনেক সুস্থ রেখেছে।’
গ্রাম সংরক্ষণ দল ও ক্ষুদ্র মূলধন বিতরণ : ইসিএ-ভুক্ত এলাকাগুলোতে গঠিত ‘গ্রাম সংরক্ষণ দল’ বনাঞ্চল ও জলজ সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া, এসব এলাকার মানুষদের স্বাবলম্বী করতে সহজ শর্তে ‘ইকো-লোন’ বা ক্ষুদ্র মূলধন বিতরণ করা হচ্ছে। গ্রাম সংরক্ষণ দলগুলোর মাধ্যমে নারীদের সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন, জৈব কৃষি এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন খাতে এই মূলধন দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের বিকল্প উপার্জনের পথ খুলে দিয়েছে।
পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, সৌরশক্তি বা আধুনিক প্রযুক্তি কেবল উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, এটি পরিবেশগত ঝুঁকি কমানোর একটি বড় উপায়। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, সরঞ্জাম স্থাপনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত তদারকি অপরিহার্য।
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ ড. আরমান চৌধুরী বলেন, ‘সৌরশক্তি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিবাচক হলেও তা সামগ্রিক ইকোসিস্টেম ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়া জরুরি। শুধু সরঞ্জাম স্থাপন করলেই পরিবেশ রক্ষা হবে না; প্রযুক্তি বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক প্রবাহের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। উন্নয়ন কর্মকা- যেন বনভূমি বা জলাধার সংকুচিত না করে। এ ছাড়া অবৈধ দখল ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো বন্ধে প্রযুক্তির চেয়েও বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আইনের কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ।’
পরিবেশবিজ্ঞান ও টেকসই উন্নয়ন গবেষক অধ্যাপক সৈয়দা মেহজাবীন খান বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন নিঃসন্দেহে সময়ের দাবি, তবে পরিবেশ রক্ষায় মূল চাবিকাঠি হলো ‘কমিউনিটি এঙ্গেজমেন্ট’ বা স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। তিনি আরও বলেন, আমাদের এখন নজর দিতে হবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর। ইসিএ এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নিঃসরণ পুরো বাস্তুসংস্থানকে বিপন্ন করে তুলছে। এ ছাড়া, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি কমিটি গঠন এবং ইসিএ প্রতিবেদন কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি।
সরকারের আইনি অবস্থান : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা-২০১৬’ এবং ‘বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন-২০১৭’-এর আওতায় ইসিএ এলাকাগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগই তাদের মূল লক্ষ্য।
এদিকে ইসিএ এলাকায় ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও এখনো বেশকিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত পর্যটন এবং বর্জ্য নিঃসরণের মতো সমস্যাগুলো পুরোপুরি নির্মূল করা চ্যালেঞ্জিং। সুন্দরবন বা সেন্টমার্টিনের মতো এলাকাগুলোতে পর্যটনের চাপ সামলানো এবং শিল্পায়নের দৌরাত্ম্য থেকে এগুলোকে মুক্ত রাখা এখন বড় প্রশ্ন। তবে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই এলাকাগুলোকে টেকসই উপায়ে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এ কে এম রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইসিএ এলাকা সুরক্ষায় আমরা গতানুগতিক আইনের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই ব্যবস্থাপনা মডেল গ্রহণ করেছি। স্থানীয় মানুষকে সংরক্ষণের অংশীদার করায় অভয়াশ্রমগুলোতে জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। সৌরশক্তিচালিত প্রকল্পগুলো প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতির ওপর চাপ কমাচ্ছে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা ডিজিটাল মনিটরিং এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে এই এলাকাগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষত রাখতে বদ্ধপরিকর।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন