বাংলাদেশ দ্রুত একটি ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, বিনোদন, সফটওয়্যার, বিজ্ঞাপন, ক্লাউড কম্পিউটিং থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সেবা এখন অপরিহার্য। ফেসবুক, গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যাডোবি, ওপেনএআই, নেটফ্লিক্স, ক্যানভা কিংবা স্পটিফাইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে কোনো বড় ধরনের দৃশ্যমান অবকাঠামো ছাড়াই প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অর্থপ্রবাহের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে রাষ্ট্রের কাছেই নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত কোনো তথ্য নেই।
এটি শুধু পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা নয়, এটি অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার একটি বড় ঘাটতি। যে রাষ্ট্র জানে না বছরে কত ডলার বিদেশে যাচ্ছে, কোন খাতে যাচ্ছে, কোন কোম্পানি কত আয় করছে কিংবা কতটুকু কর ও ভ্যাট আদায় হচ্ছে, সেই রাষ্ট্র কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা কিংবা কর প্রশাসন, কোনোটিই পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনা করতে পারে না।
বিদেশি ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়া স্বাভাবিক এবং আধুনিক অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয়ও। কিন্তু সমস্যার জায়গা হলো, এই বাজারের বড় একটি অংশ কার্যত নজরদারির বাইরে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে নেই আলাদা বার্ষিক হিসাব, এনবিআরের কাছে নেই পূর্ণাঙ্গ আয়ের চিত্র, আর ব্যাংকগুলোর তথ্যও বিচ্ছিন্ন। ফলে রাষ্ট্র জানে না, ডিজিটাল অর্থনীতির প্রকৃত আকার কত এবং এর কত অংশ বৈধ আর কত অংশ অনিয়ন্ত্রিত।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সি কিংবা অন্য অবৈধ উপায়ে বিদেশি ডিজিটাল সেবার বিল পরিশোধের অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। যদি সত্যিই বিপুল অঙ্কের বিজ্ঞাপন ব্যয় কিংবা সফটওয়্যার কেনাকাটা আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে সম্পন্ন হয়ে থাকে, তবে তা শুধু কর ফাঁকিই নয় বরং বৈদেশিক মুদ্রা পাচার, মানিলন্ডারিং এবং সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ডিজিটাল পেমেন্টের আড়ালে গড়ে ওঠা এই অদৃশ্য অর্থপ্রবাহ ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে বিদেশি ডিজিটাল সেবাদাতাদের জন্য পৃথক করনীতি, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, ডিজিটাল সার্ভিসেস ট্যাক্স, তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ডিজিটাল লেনদেন পর্যবেক্ষণ কাঠামো গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে বিচ্ছিন্ন তথ্যের পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল ট্রানজেকশন ডেটাবেজ গড়ে তোলার। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত ব্যবসার পরিমাণ নিরূপণে প্রযুক্তিনির্ভর অডিট ও তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
তবে কঠোর নজরদারির নামে বৈধ ডিজিটাল ব্যবসা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ডিজিটাল অর্থনীতি আজ বিলাসিতা নয়; এটি দেশের উৎপাদন, রপ্তানি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, শিক্ষা ও উদ্ভাবনের অন্যতম ভিত্তি। তাই প্রয়োজন এমন একটি নীতিকাঠামো, যেখানে বৈধ লেনদেন সহজ হবে, কিন্তু অবৈধ অর্থপ্রবাহের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হবে।
আমরা মনে করি ডিজিটাল যুগে তথ্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ। অথচ বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই যদি রাষ্ট্রের কাছে না থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ অনেকটাই অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো হয়ে দাঁড়ায়। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির এই বাস্তবতায় আর বিলম্বের সুযোগ নেই।
তাই এখনই বিদেশি ডিজিটাল সেবা খাতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, কর প্রশাসন এবং আর্থিক নজরদারির একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন