নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আকাশে তখন বিদায়ি আষাঢ়ের মেঘ, প্রকা- লাউডস্পিকারে বাজছে ইউরোপীয় রকের চিরচেনা সুর- ‘দ্য ফাইনাল কাউন্টডাউন’। ঘড়ির কাঁটা ছোঁয়াছুঁয়ি খেলছিল ম্যাচের ১০৬ নম্বর মিনিটের সঙ্গে। একটা ফুটবল ফাইনাল, যা দীর্ঘক্ষণ ধরে কোটি মানুষের বুক ঢিপঢিপানিতে শ্বাস আটকে রেখেছিল, হঠাৎ যেন এক ঝটকায় তার সমস্ত নাটকীয়তা উগরে দিল। মাঠের বাঁ-দিক থেকে উড়ে এলো পেদ্রো পোরোর মাপা ক্রস, নিকো উইলিয়ামস বাতাসে ভেসে মাথা ছুঁইয়ে বলটা ঠেলে দিলেন পেছনের দিকে, সেখানে বিদ্যুৎ বেগে ছুটে এসে ফেরান তোরেস ডান পায়ের আলতো টোকায় বলটা আর্জেন্টিনার জালে জড়ালেন। তখনই ইতিহাস তার রায় লিখে ফেলল। স্পেনের ডাগআউটে তখন আনন্দের সুনামি, আলবিসেলেস্তেদের গ্যালারিতে নেমে এলো অতলান্তিক নীরবতা। সবকিছু ওলটপালট করে দেওয়া এই ৩৭ সেকেন্ডই লিখে দিল ২০২৬ বিশ্বকাপের নিয়তি। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নীল হলো আর্জেন্টিনা, আর দীর্ঘ ১৬ বছর পর জার্সিতে দ্বিতীয় তারকার গৌরব এঁকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পুনরুদ্ধার করল স্পেন।
ফুটবলের প্রতিটি রৈখিক মানদ-ে, এমনকি নৈতিকতার দিক থেকেও এই ফলাফলকে ‘ফুটবলের জয়’ হিসেবে বর্ণনা করাটা কোনো বাড়াবাড়ি নয়। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে এবং বিশেষ করে ফাইনালের এই রাতে স্পেন যেভাবে ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, তাতে নিরপেক্ষ কোনো দর্শকের পক্ষে আর্জেন্টিনার অতি-আক্রমণাত্মক ও রুক্ষ কৌশলের প্রতি সহানুভূতি দেখানো কঠিন ছিল। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার বিবিসি ওয়ান-এ ম্যাচ পরবর্তী বিশ্লেষণে অকপটে তা-ই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্পেন বলের দখল নিয়ন্ত্রণ করেছে। সঠিক দলটিই জিতেছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’ পরিসংখ্যানের আলোতেও স্পেনের এই একচেটিয়া আধিপত্যের প্রমাণ মেলে। ম্যাচে ৬৫ শতাংশ বলের দখল, ১.৯৪ এক্সপেক্টেড গোল এবং গোলমুখে অনবরত ২০টি শটের আক্রমণ, যার মধ্যে ১১টিই ছিল সুনিশ্চিত অন-টার্গেট। স্পেনের ঢেউয়ের মতো ধেয়ে আসা আক্রমণের বিপরীতে আর্জেন্টিনা এ রাতে ছিল অদ্ভুত লক্ষ্যহীন ও দিশাহারা দল, যারা মাঠের নান্দনিক ফুটবল খেলার চেয়ে হয়তো প্রতিপক্ষের পা গুঁড়িয়ে দেওয়ার আদিম কৌশলে বেশি বিশ্বাসী ছিল।
ম্যাচের প্রথমার্ধের চিত্রনাট্যটি ছিল স্পেনের শৈল্পিক আক্রমণের বিপরীতে আর্জেন্টিনার ব্যাকরণহীন প্রতিরক্ষার গল্প। প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই স্পেনের বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামাল বক্সে বল ঠেলে দিয়েছিলেন দানি ওলমোর দিকে, ফিরতি বলে ইয়ামালের নেওয়া শটটি লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে লেগে সামান্য দিক পরিবর্তন করলেও আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অতিমানব এমিলিয়ানো মার্তিনেজ গ্লাভস বাড়িয়ে তা প্রতিহত করেন। এই একটি মুহূর্তই যেন গোটা ম্যাচের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিয়েছিল। স্পেন আক্রমণ করে যাবে, আর আর্জেন্টিনার হয়ে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন একজনই মানুষ। ২৮ মিনিটে ওইয়ারসাবালের জোরালো শট কিংবা কুকুরেরার বাঁ-পায়ের শটগুলো একের পর এক নস্যাৎ করে মার্তিনেজ প্রমাণ করছিলেন কেন তিনি এই দলের ভরসা। বিপরীতে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডে লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও রদ্রিগো দি পলরা বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেয়ে ফাউল করে স্পেনের গতি স্তব্ধ করতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। প্রথমার্ধেই লিসান্দ্রো মার্তিনেজের হলুদ কার্ড এবং পরবর্তীতে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের ভঙ্গুরতাকেই নগ্নভাবে ফুটিয়ে তোলে, যার ফলে মাঠে নামাতে হয় নিকোলাস ওতামেন্দিকে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ছিল আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা স্পেনের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে একটিও শট নিতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ফাইনালে কোনো দলের এমন চরম ব্যর্থতা ফুটবল বিশ্ব আর প্রত্যক্ষ করেনি। তাদের প্রথম এবং একমাত্র আক্রমণটি আসে ম্যাচের ১১৭ মিনিটে, লিওনেল মেসির পা ধরে, ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ফুটবল যার পায়ের জাদুতে যুগে যুগে সমৃদ্ধ হয়েছে, সেই ৩৯ বছর বয়সি কিংবদন্তি লিওনেল মেসি এদিন মাঠে যেন ক্লান্ত, নিঃসঙ্গ রাজার মতো বিচরণ করছিলেন। প্রথম ২০ মিনিটে তার পায়ে বল এসেছিল মাত্র দুবার। কাতারের মরুভূমিতে, এমনকি এই বিশ্বকাপের আগের ম্যাচগুলোতে যে পা গোটা বিশ্বকে মোহাচ্ছন্ন করেছিল, সেই পা যেন নিউ জার্সির ঘাসে আটকে গিয়েছিল। মেসির শরীরী ভাষায় ছিল না পুরোনো ক্ষিপ্রতা বা চেনা জ্যামিতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ছিল কেবলই বিষাদগ্রস্ত বিদায়ের সুর, যিনি বুঝতে পারছিলেন যে সময়ের চাকা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
তবুও আর্জেন্টিনা যে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত ম্যাচটিকে টেনে নিয়ে যেতে পেরেছিল, তার একক কৃতিত্ব কেবলই গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজের। তোরেসের হেড, লাপোর্তের হেডার, রদ্রির দূরপাল্লার শট কিংবা উইলিয়ামসের ক্ষিপ্র উইং আক্রমণ; সব কিছুই তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন অতিমানবীয় দক্ষতায়। ম্যাচ শেষে তার মোট সেভের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১টিতে, যা বিশ্বকাপের ফাইনালের ইতিহাসে যেকোনো গোলরক্ষকের করা সর্বোচ্চ সেভের নতুন রেকর্ড। কিন্তু একক বীরত্ব দিয়ে কতক্ষণ আর ভাগ্যের পরিহাসকে ঠেকিয়ে রাখা যায়? দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবারসিকে শূন্যে ভাসিয়ে যেভাবে আছাড় মারলেন, তার ফলে রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ তাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য করেন। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনাকে ১০৬ মিনিটে তোরেসের সেই ঐতিহাসিক গোলটি হজম করতেই হয়। শেষ মুহূর্তে হুলিয়ানো সিমিওনের হেড বারের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার শেষ আশাটুকুও আকাশে মিলিয়ে যায়।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সমীকরণের দুনিয়ায় স্পেন এখন স্পষ্টভাবে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা এবং অপরাজেয় দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করল। তারা একাধারে বিশ্ব, অলিম্পিক এবং ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন, এমনকি তাদের নারী দলও বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। সব ধরনের প্রতিযোগিতায় গত ৩৮টি ম্যাচে অপরাজিত থাকার অভূতপূর্ব রেকর্ড এখন লুইস দে লা ফুয়েন্তের এই দলটির দখলে। মজার বিষয় হলো, ২০১০ সালের মতো এবারও তারা ০-০ গোলে ড্র করে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল, যা প্রমাণ করে যে উদ্বোধীন ম্যাচে হোঁচট খাওয়াটাই যেন স্পেনের বিশ্বজয়ের অলিখিত সৌভাগ্যের প্রতীক। ফাইনালে স্পেনের মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ কতটা নিখুঁত ছিল, তার প্রমাণ মেলে পাসিংয়ের পরিসংখ্যানে। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে ১০০ বা তার বেশি পাস সম্পন্ন করার মাত্র তিনটি রেকর্ডের মধ্যে দুটিই এই ম্যাচে স্পেনের খেলোয়াড়দের; যেখানে রদ্রি ১০১টি এবং ১৯ বছর বয়সি পাউ কুবারসি ১২১টি পাস সম্পন্ন করেন। টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া কুবারসি এবং তার বার্সেলোনা সতীর্থ লামিন ইয়ামাল, যিনি পেলের পর বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা তৃতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখালেন, তাদের হাত ধরে স্প্যানিশ ফুটবলের এই জয়জয়কার নতুন সোনালি যুগের সূচনা।
বিপরীতে, মাঠের চরম ব্যর্থতার পাশাপাশি আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের আচরণ আন্তর্জাতিক মহলে তাদের মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করেছে। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই লিয়ান্দ্রো পারেদেস যেভাবে স্পেনের রদ্রি, গাভি ও বোর্হা ইগলেসিয়াসের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়লেন এবং নাহুয়েল মোলিনাকে পাশ দিয়ে যাওয়া এক স্প্যানিশ খেলোয়াড়কে ঘুষি মারতে দেখা গেল, তা আধুনিক ফুটবলের স্পিরিটকে কালিমালিপ্ত করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ওয়েন রুনি ফরাসি ও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের সুরে সুর মিলিয়ে একে ‘ন্যক্কারজনক ও লজ্জাজনক আচরণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি সংবাদ সম্মেলনে অশ্রুসিক্ত চোখে দলের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করলেও, শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হন যে সেরা এবং যোগ্য দলটিই ট্রফি জিতেছে।
তবে সমস্ত বিতর্ক, পরিসংখ্যান এবং হারের গ্লানি ছাপিয়ে এই ফাইনালের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি ছিল লিওনেল আন্দ্রেস মেসির চিরতরে আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে বিদায়ের করুণ সুর। রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা এই মহাতারকা মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে লুটিয়ে পড়ে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিলেন। রানার্স-আপ মেডেল গলায় ঝুলিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে যখন তিনি আর্জেন্টাইন ভক্তদের গ্যালারির দিকে এগিয়ে গেলেন, তখন দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমস্ত আবেগ ধরে রাখা সম্ভব হয়নি; কোটি কোটি ভক্তের চোখের সামনে অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ল তার সেই চিরন্তন বিশ্বজয়ের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। পরবর্তী বিশ্বকাপে ৪৩ বছর বয়সে পৌঁছাতে যাওয়া মেসির এটাই যে শেষ আন্তর্জাতিক অ্যাসাইনমেন্ট ছিল, তা তার এই নোনা জলেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। ফুটবল তাকে আগেই অমরত্ব দিয়েছে, কিন্তু নিউ জার্সির এই রাতটি তাকে বিদায় জানাল পরম শূন্যতার বিষাদ নিয়ে। সময় অবশেষে এক রাজাকে বৃদ্ধ করেছে, কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে তার প্রতিধ্বনির জৌলুস চিরকাল অক্ষত থাকবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন