ভারতের রাজধানী দিল্লি আবারো আন্দোলনের নগরীতে পরিণত হয়েছে। একদিকে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় কৃষকদের বিক্ষোভ; অন্যদিকে চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলনÑ এই দুই ইস্যুতে কেন্দ্রীয় সরকার একযোগে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, বিরোধী দলগুলোর প্রতিবাদ এবং সরকারের সঙ্গে ফলহীন আলোচনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে সন্ধ্যার দিকে আটক করে রাজ্য পুলিশ।
সীমান্তেই আটকে দেওয়া হলো কৃষকদের : ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বহুমাত্রিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা করে রাজধানীতে আয়োজিত কৃষক সমাবেশে যোগ দিতে পাঞ্জাব থেকে রওনা হওয়া শত শত কৃষককে হরিয়ানা পুলিশ শম্ভু সীমান্তেই আটকে দেয়। দিল্লিতে প্রবেশ করতে না পেরে কৃষকেরা সীমান্তেই অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন।
কৃষক নেতাদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশে অংশ নেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার থেকেও তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, পাঞ্জাব ও হরিয়ানাÑ দুই সরকারই এই ঘটনায় দায় এড়াতে পারে না। তবে পাঞ্জাবের কৃষকেরা আটকে গেলেও হরিয়ানার বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকদের একটি অংশ দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রাখে।
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কৃষকদের আশঙ্কা : দেশ বাঁচাও মোর্চার ব্যানারে আন্দোলনরত কৃষক সংগঠনগুলোর অভিযোগÑ ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি শুধু আমদানি-রপ্তানির বিষয় নয়; এতে কৃষি, দুগ্ধশিল্প, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সেবাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তাদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষিপণ্য কম শুল্কে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করলে দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। বিশেষ করে দুগ্ধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোটি কোটি গ্রামীণ মানুষের জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই চুক্তির সব নথি প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়ার দাবি তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে উত্তাল শিক্ষার্থীরা : অন্যদিকে চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি। তাদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং বহু শিক্ষার্থী নতুন করে পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। আন্দোলনে পরে যোগ দেন লাদাখের অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক, যিনি শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেন।
সংসদমুখী মিছিলে সংঘর্ষ : সংসদ অভিমুখে শিক্ষার্থীদের পদযাত্রা ঠেকাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যারিকেড স্থাপন করে পুলিশ। অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও হাজারো আন্দোলনকারী সংসদের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য ও আন্দোলনকারীÑ উভয় পক্ষই আহত হয়। পুলিশ দাবি করেছে, অনেক সদস্য আহত হয়েছেন এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।
আলোচনা হলেও সমাধান হয়নি : আন্দোলনের মুখে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শিক্ষার্থী নেতাদের বৈঠক হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। আন্দোলনকারীরা তিন দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করেনÑ সোনম ওয়াংচুকের মুক্তি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ।
সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিশ্রুতি না আসায় আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্দোলনের নেতারা জানান, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না।
বিরোধীদের সরব অবস্থান : শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী দলগুলো। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব অভিযোগ করেন, সাদা পোশাকে থাকা ব্যক্তিদের দিয়েও আন্দোলনকারীদের মারধর করা হয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন।
রাহুলের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় সরকারের জবাবদিহির অভাব স্পষ্ট হয়েছে। তিনি সংসদে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনারও দাবি জানান।
আদালতের অবস্থান : শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের অভিযোগে জরুরি শুনানির আবেদন করা হলেও দিল্লি হাইকোর্ট তাৎক্ষণিক শুনানিতে রাজি হয়নি। তবে মামলাটি পরবর্তী শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আদালত মন্তব্য করেছে, এ ধরনের ঘটনায় আদালতকে অযথা জড়ানো উচিত নয়।
মোদির প্রতিক্রিয়া : দীর্ঘ নীরবতার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নপত্র ফাঁসকে জাতীয় দায়িত্বের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নির্ভুল ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর প্রতি গঠনমূলক সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
আন্দোলন চলছেই : সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলেও আন্দোলন প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি শিক্ষার্থীদের সংগঠন। তারা সংসদমুখী পদযাত্রা আপাতত স্থগিত রেখে যন্তর-মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সময়ে কৃষকরাও সীমান্তে অবস্থান অব্যাহত রেখেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দুটি ভিন্ন ইস্যু হলেও কৃষক ও শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না এলে এই ক্ষোভ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সামাজিক আন্দোলনের রূপ নিতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন