× UCB Sticker Card
বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

পারভেজ খান

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ০১:২৩ এএম

মন্তব্য প্রতিবেদন

দালালের কাউন্টারে একজন আদম আলী

পারভেজ খান

প্রকাশিত: জুলাই ২২, ২০২৬, ০১:২৩ এএম

দালালের কাউন্টারে একজন আদম আলী

রাষ্ট্রের সংবিধান নাগরিককে কিছু অধিকার দিয়েছে। রাষ্ট্র বলেছেÑ তুমি মানুষ, তাই তোমার অধিকার আছে চিকিৎসা পাওয়ার। তোমার অধিকার আছে ভূমির মালিকানা নিশ্চিত করার। তোমার অধিকার আছে পাসপোর্ট পাওয়ার। তোমার অধিকার আছে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার। তোমার অধিকার আছে সরকারি সেবা পাওয়ার। কিন্তু রাষ্ট্রের সেই অধিকারের দরজায় পৌঁছানোর আগেই যদি কেউ এসে দাঁড়ায়? যদি সে বলেÑ ‘কী কাজ?’ আপনি বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি করাব।’ ‘ভেতরে আমার লোক আছে।’ ‘জমির নামজারি করাব।’ ‘টাকা দেন, সব করে দেব।’ ‘পাসপোর্ট করাব।’ ‘লাইনে দাঁড়িয়ে লাভ কী? আমার মাধ্যমে করেন।’ তখন প্রশ্ন জাগেÑ রাষ্ট্রের দরজা কি নাগরিকের জন্য খোলা, নাকি সেই দরজার চাবি এখন দালালের পকেটে?

আজ একটা গল্প মনে পড়ছে। এ গল্প সেই প্রশ্নের। এ গল্প একজন আদম আলীর। আবার হয়তো এ গল্প বাংলাদেশের অগণিত আদম আলীর।

আদম আলী একজন কৃষক। মাটির সঙ্গে যার সম্পর্ক রক্তের মতো। বছরের পর বছর যে মাটি চাষ করে সংসার চালিয়েছেন, সেই মাটিই একদিন তার কাছে হয়ে উঠল সন্তানের চিকিৎসার শেষ সম্বল। পাঁচ বছরের শিশুটি ক্যানসারে আক্রান্ত। শিশুটির চোখে তখনো পৃথিবীর রং মুছে যায়নি।

সে জানে না ক্যানসার কী। জানে না হাসপাতালের করিডর কী। জানে না কেমোথেরাপি কী। সে শুধু জানেÑ বাবার হাত শক্ত করে ধরে থাকলে ভয় কম লাগে। সেই শিশুর হাত ধরেই আদম আলী একদিন ঢাকার বড় সরকারি হাসপাতালে এলেন। হাসপাতালের ফটকের সামনে পৌঁছাতেই একজন এগিয়ে এলো। জানতে চাইল, ‘কী সমস্যা?’ আদম আলী বললেন, ‘বাবা, আমার ছেলেটা অসুস্থ। ক্যানসার।’ লোকটি শিশুটির দিকে তাকাল। তারপর বাবার দিকে। ‘ভর্তি করাবেন?’ আদম আলী সম্মতি জানালে আগত ব্যক্তি বললেন, ‘আমার সঙ্গে আসেন। না হলে অনেক ঝামেলা হবে।’

আদম আলী জানতেন না, সন্তানের জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা একজন বাবা কীভাবে ধীরে ধীরে এমন এক অদৃশ্য জালে আটকা পড়েন, যার প্রতিটি গিঁটে টাকা। তিনি টাকা দিলেন। ভর্তি হলো সন্তান। কিন্তু বাবার মনে হলো, সন্তান যেন হাসপাতালে ভর্তি হয়নি, ভর্তি হয়েছে আরেকটি অনিশ্চয়তায়। কোনো বিছানা নয়, করিডরের মেঝেতে জায়গা মিলল। চারপাশে অসংখ্য মানুষ। কেউ কাঁদছে। কেউ ছটফট করছে। কেউ স্বজনের হাত ধরে বসে আছে। কেউ স্যালাইন হাতে দাঁড়িয়ে। ওষুধ? বাইরে থেকে কিনতে হবে। পরীক্ষা? বাইরে করতে হবে। একটি পরীক্ষা। দুটি পরীক্ষা। তারপর আরেকটি পরীক্ষা। আদম আলী পকেটে হাত দেন। টাকা কমছে। শিশুটির শ^াস যেন ভারী হচ্ছে। বাবার বুকের ভেতরটা আরও ভারী।

একটু বিশেষ সুবিধার আশায় শিশুসন্তানকে নিয়ে আদম আলী ছুটলেন ক্যানসার হাসপাতালের দিকে। সেখানে গিয়ে জানলেন, চিকিৎসা আছে। কিন্তু অপেক্ষাও আছে। দীর্ঘ অপেক্ষা। কেমোথেরাপির জন্য সিরিয়াল। সিরিয়াল পেতে অপেক্ষা করতে হবে। কতদিন? এক মাস? দুই মাস? না। হয়তো আরও বেশি। আদম আলী শুনলেন, সিরিয়াল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।

আর যদি অপেক্ষা করার মতো সময় না থাকে? তাহলে? সেখানে আবার দালালদের ফিসফিস শব্দ। ‘দ্রুত কাজ করাতে চাইলে...’ বাকিটা আর বলতে হয় না। দালালরা কখনো পুরো বাক্য বলে না। তারা শুধু ইশারা করে। কারণ তারা জানেÑ মৃত্যুভয়ে কাঁপতে থাকা মানুষের কাছে ইশারাই যথেষ্ট। আদম আলী আবার পকেটে হাত দিলেন। অত টাকা নেই।

আরেকদিন। শিশুটিকে নিয়ে আদম আলী ছুটলেন শিশু হাসপাতালে। সেখানেও পরীক্ষা। সিটি স্ক্যান। এমআরআই। কিন্তু প্রয়োজনীয় সব সুবিধা সবসময় হাতের কাছে নেই। বাইরে যেতে হবে। বাইরের পরীক্ষা। বাইরের ওষুধ। বাইরের খরচ। শিশুটির শরীর তখন ভেঙে পড়ছে। বাবার সঞ্চয়ও। একদিকে সন্তানের জীবন। অন্যদিকে অর্থের হিসাব। আদম আলী হিসাব করতে বসেননি। তিনি শুধু জানতেন, ছেলেকে বাঁচাতে হবে।

আদম আলী তার শেষ সম্বল এক বিঘা জমির দিকে তাকালেন। সেই জমি বিক্রি করবেন। ছেলেকে বিদেশে নিয়ে যাবেন। কলকাতায়। হয়তো সেখানে চিকিৎসা হবে। হয়তো বাঁচবে সন্তান। হয়তো আবার হাসবে। হয়তো একদিন স্কুলে যাবে। হয়তো বাবার হাত ধরে বলবে, ‘বাবা, আমাকে সাইকেল কিনে দাও।’ এই ‘হয়তো’ নিয়েই তো মানুষ বেঁচে থাকে।

জমি বিক্রি করতে গিয়ে আরেক বিপদ। জমি তার। কিন্তু কাগজে? নামজারি হয়নি। আদম আলী গেলেন এসি ল্যান্ড অফিসে। সেখানেও কাউন্টার। সেখানেও নিয়ম। সেখানেও কাগজ। কানুনগো বললেন, ‘আরও কয়েকটা কাগজ লাগবে।’ আদম আলী অবাক। ‘স্যার, যা যা বলেছিলেন, সবই তো এনেছি।’ উত্তর আসে  ‘না, আরও লাগবে।’ আদম আলী বাইরে বেরিয়ে এলেন। তারপর আবার সেই পরিচিত কণ্ঠ, ‘চিন্তা করবেন না। আমার লোক আছে।’ আদম আলী তাকালেন। মনে হলো, এই দেশে তার চেয়ে আগে জন্মেছে বুঝি দালাল। হাসপাতালে দালাল। ভূমি অফিসে দালাল। প্রতিটি দরজার আগে যেন একটি করে অদৃশ্য দরজা। আর সেই দরজার চাবি দালালের হাতে। আদম আলী টাকা দিলেন। কাগজ হলো। নামজারি হলো। কানুনগো হাসিমুখে বিদায় দিলেন। আদম আলীও হাসলেন। কারণ তার সামনে তখনো একটা আশা ছিল। ছেলেটা বাঁচবে।

এবার জমি বিক্রি। রেজিস্ট্রি অফিস। সেখানেও নতুন কাগজ। নতুন নিয়ম। নতুন দাবি। আবার দালাল। ‘এই কাগজ লাগবে।’ ‘ওই কাগজ লাগবে।’ ‘ভায়া দলিল লাগবে।’ আদম আলী বললেনÑ ‘সব তো আছে!’ দালাল হাসল। ‘আপনি জানেন না। আমরা জানি।’ আদম আলী জানতেন না। তিনি শুধু জানতেন, সময় নেই। সন্তানেরও সময় নেই। দালালকে টাকা ধরিয়ে দিতে সব কাজই সম্পন্ন হলো। তিনি জমি বিক্রি করলেন। তাড়াহুড়ো করে। দাম পেলেন কম। দাম নিয়ে দরকষাকষি করার মতো মানসিক শক্তিও তার ছিল না। একজন বাবা যখন সন্তানের মৃত্যুর সঙ্গে লড়েন, তখন জমির বাজারদর তার কাছে আর বড় থাকে না। বড় হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন, আর কতক্ষণ বাঁচবে আমার সন্তান?

জমি বিক্রি করে হাতে কিছু টাকা এলো। চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে হবে। কলকাতা। পাসপোর্ট লাগবে। আবার পাসপোর্ট অফিস। আবার লাইন। আবার অপেক্ষা। আবার সেই চেনা মুখ। ‘ভাই, আমার মাধ্যমে করান।’ আদম আলী ভাবলেনÑ সরকারি লোকজন আছে। খাকি পোশাক পরা আনসার আছে। তারা সাহায্য করবেন। কিন্তু তিনি দেখলেন, সাহায্যের হাতও যেন কোথাও কোথাও দালালের হাতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। অনলাইনে আবেদন। অনলাইনে সেবা। অনলাইনে টাকা। তবু কেন? কেন নাগরিককে অনলাইনের সার্ভারে পৌঁছাতেও দালালের দরজায় যেতে হবে? আদম আলী জানেন না। তিনি শুধু জানেনÑ ছেলেটা অপেক্ষা করছে। তাই আবার টাকা দিলেন। কদিনে পাসপোর্ট হলো।

এবার ভারতীয় মেডিকেল ভিসা। আদম আলী ভাবলেন, এই তো শেষ। এরপর আর কোনো দালাল নেই। এরপর শুধু বিমানে উঠে সোজা হাসপাতাল। শুধু ডাক্তার। শুধু চিকিৎসা। শুধু সন্তান। কিন্তু শেষ দরজার সামনেও দাঁড়িয়ে ছিল সেই অদৃশ্য ছায়া। দালালÑ ‘ভিসা করাবেন?’ আদম আলী বললেন, ‘কত?’ দালাল বলল, ‘রোগী আর একজন অ্যাটেনডেন্টÑ তিন লাখ টাকা।’ আদম আলী স্তব্ধ। তিন লাখ! তিনি পকেটে হাত দিলেন। জমি বিক্রি করে যা ছিল, চিকিৎসা, পরীক্ষা, ওষুধ, ভর্তি আর দালালের পেছনে খরচ করে, শেষে হাতে আছে মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা। তিনি বললেন, ‘ভাই, আমার কাছে চল্লিশ হাজার আছে।’ দালাল হেসে বলল, ‘হবে না।’ আদম আলী কিছু বললেন না। হয়তো তার বলার মতো আর কোনো কথা ছিলও না। তিনি ফিরে এলেন। হাতে পাসপোর্ট। হাতে কিছু কাগজ। পকেটে চল্লিশ হাজার টাকা। আর ঘরেÑ মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা পাঁচ বছরের একটি শিশু।

সেদিন রাতে আদম আলী ছেলের পাশে বসেছিলেন। ঘরে আলো ছিল। আলো ছিল না তার চোখে। শিশুটির শরীর জ্বরে পুড়ছিল। বাবা তার কপালে হাত রাখলেন ‘বাবা...।’ শিশুটি চোখ খুলল না। আদম আলী ফিসফিস করে বললেন, ‘বাবা, আর একটু কষ্ট কর। তোকে ভিসা লাগে না, এরকম একটা দেশে নিয়ে যাব। ভালো ডাক্তার দেখাব। তুই ভালো হয়ে যাবি।’

শিশুটি চোখ মেলল না। চলে গেল। শিশুর হাতটি ধীরে ধীরে বাবার হাত থেকে আলগা হয়ে গেল। বাবাকে আর দালালের পেছনে ছুটতে দিতে চায়নি সে।

শিশুসন্তানের মরদেহ নিয়ে কবরস্থানে আদম আলী। সেখানেও দালাল। ডেথ সার্টিফিকেট লাগবে। এটা লাগবে, ওটা লাগবে। এবার আর কাউকে কোনো প্রশ্ন করেননি আদম আলী। তার এখন একটাই প্রশ্ন, সেটা তিনি রাষ্ট্রকে করতে চান। শিশুর কবরের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘বাবা, তোকে বাঁচাতে আমি অনেক হাসপাতালের দরজায় গেছি। সবখানেই দালাল এসেছে। ভূমি অফিসে গেছি। দালাল এসেছে। জমি বিক্রি করতে গেছি। দালাল এসেছে। পাসপোর্ট করতে গেছি। দালাল এসেছে। ভিসা করতে গেছি। দালাল এসেছে। শেষ পর্যন্ত দালাল ছাড়াই তুই না ফেরার দেশে চলে গেলি। ওখানে নিশ্চয়ই তোর ভালো চিকিৎসা হবে। ভালো থাকিস বাবা। তোকে রেখে আমি শুধু একবার রাষ্ট্রের কাছে যেতে চাই। আমার এখন একটাই প্রশ্নÑ সেবার জন্য তৈরি প্রতিটি দরজায় রাষ্ট্রের আগে কেন দালাল এসে দাঁড়ায়?’
 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!