কিশোরগঞ্জ জেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি ও জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র নিকলী হাওর।
ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম সড়ক তৈরি করার পর এই হাওরের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায়। বর্ষাকালে রাস্তা ও দুপাশের পানি এক হয়ে নতুন দৃশ্যের জন্ম দেয়। দূরে তাকালেই মনে হয় যেন জলের মাঝে মিলে গেছে রাস্তা। হাওরে নৌকায় ঘুরে বেড়ালে দেখতে পাবেন চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি, দ্বীপের মতো ছোট ছোট গ্রাম ও ঘরবাড়ি, স্বচ্ছ জলের খেলা এবং রাতারগুলের মতো ছোট জলাবন। হাওরের একটি প্রবাদ আছে ‘বর্ষায় নাও আর শুকনোয় বাও।’ অর্থাৎ শুকনো মৌসুমে পায়ে চলাচল হলেও বর্ষা মৌসুমে নৌকাই এখানে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম। তবে ২০২০ সালে সড়ক তৈরির পর এই প্রবাদ যেন কিছুটা মিথ্যা হয়ে গেছে।
ভ্রমনের সেরা মৌসুম
নিকলী হাওর ভ্রমণের উপযুক্ত সময় জুলাই মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত। এ সময় হাওর ভ্রমণে গেলে আসল সৌন্দর্য দেখতে পাবেন। আবার শীতকালে পানি শুকিয়ে যায়। তখন আবার হাওরের ভিন্ন সৌন্দর্য দেখতে পাবেন।
যেভাবে যাবেন
রাজধানী ঢাকা, কিশোরগঞ্জ বা আশপাশের অন্যান্য জেলা থেকে বাস, ট্রেন এবং সিএনজি করে নিকলী যেতে পারবেন।
কোথায় খাবেন
নিকলী পৌঁছে সিএনজি থেকে যেখানে নামবেন সেখানে খাবার জন্য মোটামুটি মানের বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাবার হোটেল ক্যাফে ঢেউ ও হোটেল সেতু। এসব হোটেলে হাওড়ের তাজা মাছ, মাছের ভর্তা, হাঁসের মাংস, মুরগির মাংস, গরুর মাংসসহ বিভিন্ন আইটেমের খাবার পাবেন। হাওরের তাজা মাছ খেতে ভুল করবেন না। কম খরচে ১৫০-৩৫০ টাকার মধ্যে ভরপেট খেতে পারবেন।
যেখানে থাকবেন
বর্তমানে নিকলী হাওর জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় পর্যটকদের কথা চিন্তা করে মোটামুটি মানের বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এ ছাড়া নিকলী উপজেলা ডাক বাংলো তে অনুমতি নিয়ে থাকতে পারেন। বন্ধুরা মিলে নৌকায় ক্যাম্পিং করতে পারেন তবে নিরাপদ নয়। এক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের সাহায্য নিতে পারেন।
উপভোগ করুন নিকলী
সিএনজি থেকে নেমে প্রয়োজনীয় কাজ ও খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সিএনজি করে বেড়ি বাঁধের শেষ প্রান্তে নৌকা ঘাটে চলে আসুন। সেখান থেকে আপনার হাতে থাকা সময় অনুযায়ী কয়েক ঘন্টার জন্য নৌকা ভাড়া কর”ন। ছোট নৌকা ভাড়া প্রতি ঘণ্টা ৩০০-৪০০ টাকা এবং বড় নৌকা ভাড়া প্রতি ঘন্টা ৭০০-৮০০ টাকা (অবশ্যই ভাড়া দামাদামি করে নেবেন)। একটি নৌকায় ১০-২০ জন উঠতে পারবেন।
নৌকা ভাড়া করে হাওরের চারপাশের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে প্রথমে যাবেন ছাতিরচর গ্রামে। সেখানে সিলেটের রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট এর মতো জলাবন আছে। জলাবনের ভেতর নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। এখানে অনেক গোসল করে, পানিতে লাফালাফি করে আপনি করতে পারেন। সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট পড়ে নিবেন।
জলাবনের সৌন্দর্য ও গোসল শেষে নৌকা নিয়ে চলে যাবেন চর মনপুরায়। অতিরিক্ত বৃষ্টির পানিতে চর মনপুরা ডুবে যায়। তবে পানি কম থাকলে এই চরে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। এরপর পড়ন্ত বিকালের সূর্য দেখতে দেখতে নিকলী বেড়ি বাঁধ ঘাটে ফিরে আসবেন।
নিকলী হাওর ঘুরে দেখার পাশাপাশি মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনা হাওর ঘুরে দেখতে পারেন। নৌকায় নিকলী নৌকা ঘাট থেকে মিঠামইন যেতে প্রায় ২ ঘণ্টা সময় লাগে। নৌকায় মোটরসাইকেল নেওয়ার সুবিধা পাবেন। মিঠামইন থেকে মোটরসাইকেল বা সিএনজি করে হাওরের সড়ক ধরে অষ্টগ্রাম যেতে পারবেন। মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম সড়ক মোটরসাইকেল বা সিএনজি করে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা। ঘুরে দেখতে পারেন মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম জিরো পয়েন্ট। এখানে প্রতিদিন দর্শনার্থীরা ভিড় জমায়।
খরচ কত
ঢাকা থেকে নিকলী বাস ভাড়া ৩০০-৩৫০ টাকা। ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ ট্রেন ভাড়া ১৩৫-২৪৮ টাকা। মানিকখালী বা গচিহাটা রেলস্টেশন থেকে নিকলী পর্যন্ত লোকাল সিএনজি ভাড়া ৬০-৭০ টাকা, রিজার্ভ ৩৫০-৪০০ টাকা।
সেরা ট্যুর প্যাকেজ
সকালের নাস্তা খরচ ৬০-৭০ টাকা এবং দুপুরের খাবার খরচ ২৫০-৩০০ টাকা। নিকলী নৌকা ঘাট থেকে প্রতি ঘণ্টা নৌকা ভাড়া ৩০০-৪০০ থেকে ৫০০-৬০০ টাকা। ৫-৬ ঘণ্টার জন্য নৌকা ভাড়া ২,০০০-৩,০০০ টাকা পর্যন্ত।
আশপাশের দর্শনীয় স্থান
নিকলী হাওর দেখার পাশাপাশি এ এলাকায় আরও বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে। যদি সময় থাকে রিকশা বা অটোতে করে ঘুড়ে আসতে পারেনÑ নিকলী বেড়িবাঁধ, গুরই প্রাচীনতম আখড়া, পাহাড় খাঁর মাজার, গুরই শাহী জামে মসজিদ উল্লেখযোগ্য।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন