× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৬, ০৫:৫৫ এএম

‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৬, ০৫:৫৫ এএম

‘অপারেশন প্রজেক্ট ফ্রিডম’

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ। পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের টানটান উত্তেজনা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামান্য ভুল সিদ্ধান্তও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। এই সংকটের মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন নতুন সামরিক অভিযানÑ ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানের উদ্দেশ্য হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে বের করে আনা। তবে ইরান একে সরাসরি উসকানি হিসেবে দেখছে এবং কড়া প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি উত্তেজনা : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় কূটনৈতিক আলোচনা চলার মধ্যেই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন বলে দাবি করা হয়। এর জবাবে ইরান পরবর্তী ৩৯ দিনে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে শতাধিক হামলা চালায়।

পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিলে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পরে ইসলামাবাদে দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় ১৩ এপ্রিল হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপ করে ইরান। সেই অবরোধ এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি।

বিশে^র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শত শত জাহাজ আটকা পড়ে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে তেল পরিবহনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। বিশে^র প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত বৈশি^ক উদ্বেগে রূপ নেয়।

‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ কী? : এই পরিস্থিতির মধ্যেই ট্রাম্প ঘোষণা দেন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে নতুন সামরিক-নৌ অভিযান। তার ভাষায়, এটি একটি মানবিক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে আটকে পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হবে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, বহু দেশ তাদের জাহাজ উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। তিনি দাবি করেন, এই দেশগুলো সংঘাতের অংশ নয় এবং তাদের জাহাজ নিরাপদে চলাচল নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক দায়িত্ব।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যাঞ্চলীয় কমান্ড জানিয়েছে, অভিযানে প্রায় ১৫ হাজার সেনা অংশ নেবে। পাশাপাশি থাকবে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ, শতাধিক যুদ্ধবিমান এবং উন্নতমানের মানববিহীন আকাশযান। সোমবার থেকেই হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদ পথ দেখানো এবং আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

ইরানের কঠোর সতর্কবার্তা : তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে তেহরান। ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো বিদেশি যুদ্ধজাহাজ হরমুজ অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারবে না। ইরানের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা ‘দৃঢ় ও দ্রুত সতর্কবার্তা’ দিয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি ডেস্ট্রয়ারকে প্রণালিতে প্রবেশ থেকে বিরত রেখেছে। খতম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আবদুল্লাহি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কোনো বিদেশি বাহিনী যদি হরমুজের কাছে আসে বা প্রবেশের চেষ্টা করে, তা হলে তাদের ওপর হামলা চালানো হবে। তিনি আরও বলেন, ইরান পূর্ণ সক্ষমতা দিয়ে হরমুজের নিরাপত্তা বজায় রাখবে এবং ইরানের বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাংকারকে ওই পথ ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ইরানের এই অবস্থানের ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা অভিযান চালাবে, আর ইরান বলছে তারা প্রতিরোধ করবে।

হরমুজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ : হরমুজ প্রণালি পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলোর একটি। মাত্র ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি আশি লাখ থেকে দুই কোটি ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। বৈশি^ক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল।

সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়েই এশিয়া ও ইউরোপে পৌঁছে। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ^বাজারে বড় ধাক্কা তৈরি করে।

বর্তমান সংঘাতের কারণে বহু জাহাজ মাঝসমুদ্রে আটকে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার নাবিক দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

বিশ^বাজারে জ্বালানি আতঙ্ক : হরমুজে অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশি^ক জ্বালানি বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে প্রতি গ্যালন জ্বালানির দাম ছিল প্রায় তিন ডলারের নিচে, সেখানে এখন তা চার ডলারেরও বেশি। বিশ্ববাজারে চাপ কমাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। সৌদি আরব ও রাশিয়াসহ সাতটি দেশ তেল উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। ভার্চুয়াল বৈঠকে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী মাস থেকে প্রতিদিন অতিরিক্ত এক লাখ আটাশি হাজার ব্যারেল তেল বাজারে সরবরাহ করা হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় অচল থাকলে বিশ^ অর্থনীতি বড় ধাক্কা খেতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কারণ তাদের জ্বালানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

মানবিক সংকটও বাড়ছে : শুধু সামরিক উত্তেজনাই নয়, সংঘাতের ফলে মানবিক বিপর্যয়ও বাড়ছে। ইরানের লিগ্যাল মেডিসিন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংঘাতে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। চিকিৎসাকর্মীরাও হামলার শিকার হয়েছেন। হরমুজে আটকে থাকা জাহাজগুলোর নাবিকদের অবস্থাও ভয়াবহ। বহু জাহাজে খাবার ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী ফুরিয়ে আসছে। ট্রাম্প এই বিষয়টিকে সামনে এনে অভিযানের পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করছেন।

তবে সমালোচকদের মতে, মানবিক সহায়তার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্র মূলত কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইরান এটিকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে হুমকি হিসেবে দেখছে।

নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা : বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি যেকোনো সময় ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে হরমুজে প্রবেশের চেষ্টা করে এবং ইরান তা বাধা দেয়, তা হলে সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত বাস্তবতায় ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ তাই শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়; এটি হয়ে উঠেছে বৈশি^ক শক্তির লড়াই, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন এক অনিশ্চয়তার প্রতীক।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!