ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ফের যুদ্ধের কালো ছায়া

তেহরানের রাস্তায় যুদ্ধ প্রস্তুতি, অস্ত্র প্রশিক্ষণে নারী-শিশুও

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ০৬:৪২ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের গন্ধ। কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল এখনো পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে যুদ্ধবিরতির নীরবতার ভেতরেও বিস্ফোরণের শব্দ যেন শোনা যাচ্ছে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন উত্তেজনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে। রাজধানী তেহরান থেকে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর দিকেও বাড়ছে অস্থিরতার ছাপ। ইরানের বিভিন্ন শহরে এখন প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। নারী, পুরুষ, এমনকি কিশোরদেরও সামরিক প্রস্তুতির অংশ হতে দেখা যাচ্ছে। সরকারপন্থি সমাবেশ, যুদ্ধের আহ্বান, রাষ্ট্রীয় প্রচার ও সামরিক সতর্কতার মধ্য দিয়ে দেশটি যেন নতুন সংঘাতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে।

তেহরানের চত্বরে অস্ত্র হাতে নারী-পুরুষ : তেহরানের ব্যস্ত হাফতে তির চত্বরে সামরিক পোশাক পরা প্রশিক্ষকদের ঘিরে জড়ো হয়েছেন সাধারণ মানুষ। কেউ অস্ত্র খোলা ও জোড়া লাগানো শিখছেন, কেউ আবার গুলি ছোড়ার নিয়ম শুনছেন মনোযোগ দিয়ে। সেখানে উপস্থিতদের মধ্যে বিশ^বিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণী যেমন আছেন, তেমনি আছেন গৃহিণী ও কিশোররাও। শুধু একটি স্থানেই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন অস্থায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। ভানক চত্বরে দেখা গেছে, কালো চাদর পরা এক নারীকে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ব্যবহারের কৌশল শেখানো হচ্ছে। কয়েক কদম দূরে এক শিশুকে খেলনার মতো অস্ত্র হাতে অনুকরণ করতে দেখা যায় যুদ্ধের দৃশ্য। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও এখন যুদ্ধ প্রস্তুতির ভাষা জোরালোভাবে প্রচার করছে। টেলিভিশনের উপস্থাপকরা সরাসরি সম্প্রচারে অস্ত্র হাতে হাজির হচ্ছেন। কেউ কেউ গুলি চালানোর প্রদর্শনীও করছেন। সরকারপন্থি প্রচারে বলা হচ্ছে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জনগণকেও প্রস্তুত থাকতে হবে।

যুদ্ধের ভয়, নাকি জাতীয় প্রতিরোধ? : ইরানের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী পরিস্থিতিকে জাতীয় প্রতিরোধের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও হামলার পরিকল্পনা করছে। তাই জনগণকে মানসিক ও সামরিকভাবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন। রাজধানী তেহরানের এক তরুণী বলেন, দেশের জন্য জীবন দিতেও তিনি প্রস্তুত। তার মতে, ইরানের সেনাবাহিনী ও সামরিক নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। তবে ভিন্ন মতও রয়েছে। তেহরানের এক বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষক পরিচয় গোপন রেখে বলেন, সাধারণ মানুষ যুদ্ধ নয়, স্বাভাবিক জীবন চায়। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু চাই আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ থাকুক। প্রতিদিন যুদ্ধের ভয় নিয়ে বাঁচতে চাই না।’ এই দুই বিপরীত অনুভূতিই এখন ইরানের সমাজে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদী আবেগ, অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞায় ক্লান্ত মানুষের আতঙ্ক।

দোহা হামলার পর বদলে গেছে যুদ্ধের হিসাব : বর্তমান উত্তেজনার পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কাতারের রাজধানী দোহায় একটি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিশ^জুড়ে আলোড়ন তোলে। হামলার লক্ষ্য ছিল একটি রাজনৈতিক বৈঠক, যেখানে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলÑ ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান কাতারের আকাশসীমায় প্রবেশ না করেই দূর থেকে হামলা চালায়। পরে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে তেহরানেও হামলার অভিযোগ ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে শত্রু দেশের আকাশে ঢুকে হামলা চালানো ছিল বড় ঝুঁকির বিষয়। এখন দূরপাল্লার সমন্বিত প্রযুক্তি ব্যবহারে সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কমে গেছে। এই নতুন পদ্ধতিতে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয়, সাইবার নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সমন্বিত যুদ্ধপ্রযুক্তি এক সঙ্গে কাজ করছে। ফলে যুদ্ধ এখন আর শুধু সীমান্তের লড়াই নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর এক জটিল সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

ইসরায়েলে নামছে মার্কিন সামরিক বিমান : পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন খবর আসে, জার্মানিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদবাহী একাধিক কার্গো বিমান ইসরায়েলে পৌঁছেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব সরঞ্জাম সেনাবাহিনীর ‘অভিযান প্রস্তুতি’ শক্তিশালী করার জন্য আনা হয়েছে। যদিও কী ধরনের অস্ত্র এসেছে, তা প্রকাশ করা হয়নি। এ নিয়ে জল্পনা ছড়িয়ে পড়ে যে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত শান্তি চুক্তি না হলে ইরানের ‘আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’। তার এই বক্তব্যের পর তেহরানে সরকারপন্থি বিক্ষোভও হয়েছে।

শান্তি আলোচনা থমকে, বাড়ছে সংঘাতের আশঙ্কা : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনা এখন কার্যত স্থবির। উভয়পক্ষই একে অপরের শর্ত মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানকে পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করতে হবে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশ হস্তান্তর করতে হবে। অন্যদিকে তেহরান চাইছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত সম্পদ ফেরত এবং যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ। এই অচলাবস্থার মধ্যেই আবার সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে দুই পক্ষ। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সম্ভাব্য নতুন হামলার জন্য পরিকল্পনা তৈরি করছে পেন্টাগন। ইরানের সামরিক স্থাপনা ও পারমাণবিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর জবাবে ইরানও হরমুজ প্রণালিজুড়ে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি পুনরায় সক্রিয় করেছে। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন হামলা হলে তার জবাব হবে ‘অভূতপূর্ব’।

উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোও উদ্বেগে : উত্তেজনার রেশ এখন শুধু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছে তেহরান। ইরানের প্রভাবশালী নেতা মোহসেন রেজায়ি অভিযোগ করেন, আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে। তিনি বলেন, ইরান এখনো ধৈর্য ধরছে, কিন্তু সেই ধৈর্যেরও সীমা আছে।

এই সতর্কবার্তাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইসরায়েলের প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে ইরান আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।

তেলের বাজারেও যুদ্ধের প্রভাব : সংঘাতের আশঙ্কা ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারেও প্রভাব ফেলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতে নতুন অস্থিরতার শঙ্কায় উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। কারণ এই পথ দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি তেল পরিবহন হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে শুধু অঞ্চল নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই নতুন সংকটে পড়তে পারে।

যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য : মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো অঞ্চলকে ভয়াবহ সংঘাতে ঠেলে দিতে পারে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও বিশ^াসের সংকট এতটাই গভীর যে, যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতি বিস্ফোরিত হতে পারে। তেহরানের চত্বরে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ, ইসরায়েলে নামা সামরিক বিমান, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, আর উপসাগরীয় অঞ্চলে বাড়তে থাকা সামরিক তৎপরতাÑ সব মিলিয়ে অঞ্চলজুড়ে এখন এক অদৃশ্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শান্তির আলোচনা টিকে থাকবে, নাকি আবারও আগুনে জ্বলবে মধ্যপ্রাচ্যÑ এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।