বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে সামনের পথ দুটি হলেও উভয় পথই ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা, অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংঘাত দ্রুত শেষ হলেও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমবে; আর যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বহু দেশ গভীর অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্যারিসভিত্তিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার সর্বশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বা জ¦ালানি সরবরাহ কেন্দ্র অচল হয়ে গেলে পুরো পৃথিবীর উৎপাদন, বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা কতটা বিপর্যস্ত হতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতি তার স্পষ্ট উদাহরণ।
যুদ্ধের দুই সম্ভাব্য পরিণতি : সংস্থাটির বিশ্লেষণে দুটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম চিত্রে ধরে নেওয়া হয়েছে যে চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল হবে এবং জ¦ালানি সরবরাহে তৈরি হওয়া সংকট দ্রুত কেটে যাবে। সে ক্ষেত্রে বিশ্ব অর্থনীতি ধীরগতির হলেও স্থিতিশীল থাকবে। তবে দ্বিতীয় চিত্রে ধরা হয়েছে, সংঘাত আগামী বছরজুড়ে অব্যাহত থাকবে এবং জ¦ালানি ও বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়বে। প্রথম পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি সামান্য কমলেও অর্থনৈতিক কর্মকা- সচল থাকবে। কিন্তু দ্বিতীয় পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ¦ালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন ছাড়া এশিয়ার অধিকাংশ অর্থনীতি জ¦ালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজ চলাচলে বিঘœ এবং সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় বাড়লে এসব দেশের শিল্প ও ভোক্তা খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ : যুদ্ধের অন্যতম তাৎক্ষণিক প্রভাব হচ্ছে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি। জ¦ালানি ব্যয় বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, আর তার প্রভাব পড়ে খাদ্য, শিল্পপণ্য ও দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের ওপর। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ে। বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর জোটভুক্ত দেশগুলো ইতোমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে এই চাপ আরও বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়ানোর পথ বেছে নিতে হতে পারে, যা আবার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে প্রবৃদ্ধি কমে যায়, কিন্তু মূল্যস্ফীতি থেকে যায়। এই দ্বৈত সংকট নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : আশীর্বাদ নাকি নতুন নির্ভরতা?
বিশ্ব অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত খাতগুলোর একটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিপুল বিনিয়োগ, নতুন প্রযুক্তি এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনার কারণে এই খাতকে অনেকেই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ অর্থনৈতিক কর্মকা-কে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ, উন্নত গণনাব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গবেষণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এর ফলে কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটছে।
তবে এই উন্নয়নের মধ্যেও লুকিয়ে আছে নতুন ঝুঁকি। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অর্থনীতি বাস্তবে জ¦ালানি, অর্ধপরিবাহী উপাদান এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, যে প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির প্রধান শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেই প্রযুক্তির বিকাশও নির্ভর করছে এমন কিছু খাতের ওপর, যেগুলো ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
তথ্যকেন্দ্র ও বিদ্যুতের চাহিদা : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বিস্তারে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। তথ্যকেন্দ্রগুলো দিনরাত চালু রাখতে হয় এবং উন্নত গণনা প্রক্রিয়ার জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং জ¦ালানির দাম বাড়ে, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বাড়বে। এর ফলে তথ্যকেন্দ্র পরিচালনা ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে এবং প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতার একটি হয়ে উঠতে পারে জ¦ালানি সরবরাহ।
অর্ধপরিবাহী শিল্পের সংকট : আধুনিক প্রযুক্তির প্রাণভোমরা হলো অর্ধপরিবাহী উপাদান। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে উন্নত গণনাযন্ত্র, তথ্যকেন্দ্র, সামরিক প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার অপরিহার্য। কিন্তু এই শিল্পের কাঁচামাল, উৎপাদনব্যবস্থা ও পরিবহন নেটওয়ার্ক অত্যন্ত জটিল। মহামারি, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে গত কয়েক বছরে একাধিকবার এই সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। বর্তমান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্ধপরিবাহী শিল্প আবারও সংকটে পড়তে পারে। এতে প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যাবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে।
বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ : ওমান উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং পারস্য উপসাগর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ¦ালানি পরিবহন রুটগুলোর মধ্যে একটি। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একে অপরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলছে। একই সময়ে কুয়েতে ড্রোন হামলা, যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে আক্রমণের দাবি এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে এবং ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে শত্রুতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবু পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। যে কোনো নতুন সংঘর্ষ আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কঠিন সময় : বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বর্তমানে অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের নীতি অনুসরণ করছে। তারা পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে চাইছে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এই অবস্থায় সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যেতে পারে। আবার সুদের হার না বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এমন এক অবস্থায় রয়েছে, যেখানে যে কোনো সিদ্ধান্তেরই নেতিবাচক দিক রয়েছে।
ঋণ, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও সীমিত সুযোগ : বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে উচ্চ ঋণের চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জনসংখ্যার বার্ধক্য, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় এবং প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি বরাদ্দ। ফলে অর্থনীতি চাঙা করতে সরকারগুলো যে বড় ধরনের ব্যয় কর্মসূচি নিতে পারে, সেই সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত হয়ে পড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আগামী কয়েক বছরে অনেক দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
অনিশ্চয়তার যুগে বিশ্ব অর্থনীতি : বাণিজ্য সংঘাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাÑ সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি এক নতুন অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে, আর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতি এখনো স্থিতিস্থাপক হলেও তা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে প্রবৃদ্ধি কমে যাবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং নতুন অর্থনৈতিক সংকটের ঝুঁকি তৈরি হবে। বিশ্ব অর্থনীতির সামনে তাই এখন দুটি পথ খোলা। একটি অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির, অন্যটি গভীর সংকটের। কোন পথে বিশ্ব এগোবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ¦ালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্বের ওপর। বর্তমান বাস্তবতায় এতটুকু স্পষ্টÑ ২০২৬ সাল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হবে কঠিন পরীক্ষা ও অনিশ্চয়তার আরেকটি বছর।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন