বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ কমিশনারদের পদত্যাগ এবং নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। অবশেষে চেয়ারম্যান ও চার কমিশনারের পদত্যাগ এবং নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের মধ্য দিয়ে সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এই পরিবর্তন শেয়ারবাজারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সম্প্রতি বাজারে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও বৃহস্পতিবারের লেনদেনের শুরুতে সূচকে কিছুটা সংশোধনের আভাস ছিল। টানা সাত কার্যদিবসের উত্থানের পর অনেক বিনিয়োগকারী স্বাভাবিক দর সংশোধনের প্রত্যাশা করছিলেন। তবে রাশেদ কমিশনের পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাজারে ক্রয়চাপ বৃদ্ধি পায় এবং দিনভর সূচক ইতিবাচক ধারায় অবস্থান করে। এতে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ায় মূল্যসূচকও বেড়েছে। সেইসঙ্গে ডিএসইতে প্রায় ৯ মাস বা গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর সব থেকে বেশি লেনদেন হয়েছে।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ২৪২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ১০৪টির এবং ৪৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিকে, ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১৩৫টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৪২টির দাম কমেছে এবং ১৯টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ৪০টি কোম্পানির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২৯টির এবং ৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৬৬টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৩৩টির এবং ২১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মধ্যে ১৮টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৬টির দাম কমেছে এবং ১০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।
দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৩৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪৭৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৯ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ১০৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে। বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১১ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৬৮ পয়েন্টে উঠে এসেছে।
মূল্যসূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে চলতি বছরের সর্বোচ্চ লেনদেনের ঘাটনা ঘটেছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৫১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১ হাজার ২৭৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ৭২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর ডিএসইতে সর্বোচ্চ লেনদেন হলো।
এই লেনদেনে সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে এনসিসি ব্যাংকের শেয়ার। কোম্পানিটির ৩৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৩৩ কোটি ৯১ লাখ টাকার। ২১ কোটি ৪১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে নাভানা ফার্মা।
এ ছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছেÑ মনোস্পুল পেপার, মুন্নু সিরামিক, কাসেম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, লাভেলো আইসক্রিম, যমুনা ব্যাংক, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং মীর আখতার হোসেন লিমিটেড। অন্য শেয়ারবাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই বেড়েছে ৮২ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৫৫ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৫২টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৭৪টির এবং ২৯টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ২৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৩১ কোটি ৮ লাখ টাকা।
বিএসইসির নতুন চেয়ারম্যান, তিন কমিশনার নিয়োগ
খন্দকার রাশেদ মাকসুদ পদত্যাগ করার পর বিএসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের মাসুদ খানকে নিয়ন্ত্রক সংস্থারটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিন কমিশনার হিসেবে নারী আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান এবং ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নাফিজ-আল-তারিক নিয়োগ পেয়েছেন। প্রত্যেকেই চার বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন। মাসুদ খানকে নিয়োগ দিয়ে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ৫(২) অনুযায়ী তাকে বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যোগদানের তারিখ থেকে আগামী চার বছরের জন্য তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাকে অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে হবে। তার বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন