চারদিকে যুদ্ধের ধোঁয়া কিছুটা পাতলা হয়েছে বটে, কিন্তু ইরানের আকাশ থেকে অস্থিরতার মেঘ এখনো সরেনি। সামরিক সংঘাতের ভয়াবহতা পেরিয়ে দেশটি যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে, তখন তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আরও কঠিন কিছু প্রশ্ন। বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, সম্ভাব্য বিদ্যুৎ সংকট, কর্মসংস্থানের সংকোচন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক অবরোধের চাপÑ সব মিলিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী ইরান যেন নতুন এক লড়াইয়ের শুরুতে দাঁড়িয়ে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধের ক্ষত দৃশ্যমান অবকাঠামোর বাইরে গিয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি শতকরা ১৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। মাংস ও মুরগির দাম বেড়েছে প্রায় ১৭৬ শতাংশ। ফলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও মানুষের কষ্ট কমার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। সমাজবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা আরও গভীর। তাদের মতে, যুদ্ধের আগে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব ও সামাজিক অসন্তোষ মানুষের ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, তার কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি। বরং অবরোধ, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থবিরতায় সেই সংকট আরও বেড়েছে। মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমছে, কিন্তু তা প্রকাশের সুযোগ সীমিত। ফলে পরিস্থিতি যেকোনো সময় নতুন অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
বিদ্যুতের আলো নিভে যাওয়ার আশঙ্কা : যুদ্ধের কারণে অবকাঠামোগত ক্ষতির প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ খাতেও। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, উৎপাদন সচল রাখতে জনগণকে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য প্রস্তুত থাকতে হতে পারে। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাৎক্ষণিক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা নাকচ করলেও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমছে না। কারণ, জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদনব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। অনেকের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক অবরোধ শিথিল হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল বিদেশি অর্থপ্রবাহ বা বিনিয়োগ দিয়ে সংকট কাটানো সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, স্বচ্ছ নীতি এবং কার্যকর পরিকল্পনা ছাড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা কঠিন হবে।
শান্তি চুক্তির পথ এখনো কণ্টকাকীর্ণ : ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর একশ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি হয়নি। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছে, আলোচনা হয়েছে, মধ্যস্থতার চেষ্টা হয়েছে; কিন্তু কোনো পক্ষই চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। একদিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলার খবর সামনে আসছে। ফলে পরিস্থিতি অনেকটা এমনÑ যুদ্ধও নয়, আবার পূর্ণ শান্তিও নয়। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এর মাধ্যমে সাময়িকভাবে সংঘাত বন্ধ রাখা হতে পারে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি, অবরুদ্ধ সম্পদ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং তেল রপ্তানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি হরমুজ প্রণালি : মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশে^র উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণকে ইরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত শক্তির অন্যতম উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রের একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রকাশ্যে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি তাদের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধের হাতিয়ার। তাদের ভাষ্যে, এটি এমন এক শক্তি, যা পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বেশি কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। বিশ্লেষকদের মতে, এই জলপথ ঘিরে অনিশ্চয়তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, গোটা বিশে^র অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করতে পারে। কারণ, এখানকার অস্থিরতা সরাসরি জ্বালানির দামে প্রভাব ফেলে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে।
পাল্টাপাল্টি হামলায় টালমাটাল যুদ্ধবিরতি : সাম্প্রতিক সময়ে আবারও উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা কয়েকটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ইরানের নজরদারি স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে উভয়পক্ষের বক্তব্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জব্দ সম্পদ নিয়ে অচলাবস্থা : শান্তি চুক্তির আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে জব্দ থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ সম্পদের বিষয়টি। ইরানের অবস্থান স্পষ্টÑ এই অর্থ ফেরত দেওয়া হলে তা দুই দেশের মধ্যে আস্থা তৈরির প্রথম ধাপ হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এই অর্থ ছাড়ের বিষয়ে দ্বিধা রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, এতে তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগের বড় একটি উপায় হারিয়ে যেতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক এই ইস্যুও কূটনৈতিক অচলাবস্থার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধ নিয়ে বাড়ছে মার্কিন অসন্তোষ : এই দীর্ঘ সংঘাতের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়ছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে সমর্থনের চেয়ে বিরোধিতাই বেশি। অনেকের মতে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ এখন আর কেবল পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়; এটি ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনের অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে।
শান্তি টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ : যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেরিয়ে আসা কোনো দেশের জন্য পুনর্গঠন কখনো সহজ নয়। ইরানের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা ভিন্ন নয়। অর্থনৈতিক অবরোধ, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা, সামাজিক অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক অবিশ^াসÑ সব মিলিয়ে দেশটি এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর কে জিতল বা কে হারল, তা নয়। প্রশ্ন হলোÑ শান্তি কি টিকে থাকবে? মানুষ কি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে? নাকি যুদ্ধের ক্ষত ধীরে ধীরে ইরানের স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হবে? উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্টÑ ইরানের সামনে সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি সম্ভবত এখন শুরু হয়েছে। সেটি অস্ত্রের নয়Ñ অর্থনীতি, আস্থা, পুনর্গঠন এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার যুদ্ধ।

