মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক তরুণকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে সামরিক জান্তা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। ফলে একসময় ধারাবাহিক সাফল্য পাওয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে। বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত একটি পাহাড়ি শিবিরে আশ্রয় নেওয়া চার তরুণের অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠেছে এই বাস্তবতা। তাদের কেউই স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি। একজন রাঁধুনি, আরেকজন বন বিভাগের কর্মী। কাউকে রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে, কাউকে গভীর রাতে আটক করা হয়েছে, আবার কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে সেনাবাহিনীতে পাঠানো হয়েছে। ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সি এসব তরুণের দাবি, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই তাঁদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। চার মাসের প্রশিক্ষণ শেষে কারেন অঞ্চলের সম্মুখসারিতে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পরে সুযোগ বুঝে তারা পালিয়ে বিদ্রোহীদের আশ্রয়ে যান। তাদের ভাষ্য, সেখানে তারা শত্রু নয়, বরং মানুষের মতো আচরণ পাচ্ছেন। ২০২৪ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আইন কার্যকরের পর থেকেই যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বিদ্রোহী কমান্ডারদের মতে, এই আইনের ফলে জান্তা বাহিনী কার্যত সীমাহীন জনবল পেয়েছে। অন্যদিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো তীব্র অর্থসংকট ও অস্ত্রের ঘাটতিতে ভুগছে। বিদ্রোহী নেতারা আরও স্বীকার করছেন, অনিচ্ছায় যোগ দেওয়া সেনারাও সময়ের সঙ্গে সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ যোদ্ধায় পরিণত হচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার ফলে জান্তা বাহিনীর আকাশশক্তি বেড়েছে। যুদ্ধবিমান ও দূরনিয়ন্ত্রিত উড়ন্ত যন্ত্রের ব্যবহারে তারা এখন অনেক বেশি কার্যকর।
অন্যদিকে চীনের মধ্যস্থতায় কয়েকটি যুদ্ধবিরতি এবং সরবরাহপথে নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের অবস্থান আরও দুর্বল করেছে। তবু লড়াই থামাতে রাজি নন বিদ্রোহীরা। একটি অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এক আহত কমান্ডার জানান, ল্যান্ডমাইনে পা হারিয়েও তিনি আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে চান। তার ভাষায়, পিছু হটার আর কোনো পথ নেই। যুদ্ধের নির্মমতার মধ্যেও মানবিকতার আলো নিভে যায়নি। একই চিকিৎসাকেন্দ্রে এক বিদ্রোহী দম্পতির ঘরে জন্ম নিয়েছে এক কন্যাশিশু। তার নাম রাখা হয়েছে ‘সু পেয়ে’Ñ অর্থাৎ পূরণ হওয়া ইচ্ছা। বাবা-মায়ের বিশ্বাস, একদিন যুদ্ধ শেষ হবে এবং শান্ত, স্বাধীন মিয়ানমারে তাদের সন্তান বড় হয়ে উঠবে।

