ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

রইদ : তাল যখন সিনেমার অনুষঙ্গ

রেজাউর রহমান রিজভী
প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ০৬:৫১ এএম

অফিসে আসার পথে দেখলাম একজন খোলাভ্যানে তাল বিক্রি করছেন। বর্ষাকালে ভ্যানে করে তাল বিক্রি করার দৃশ্যটা সবার কাছেই স্বাভাবিক। কিন্তু এবার তাল বিক্রির দৃশ্য দেখে মাথায় সঙ্গে সঙ্গে এলো ‘রইদ’ সিনেমার নাম! ঈদের এক সপ্তাহ পর যখন ‘রইদ’ সিনেমা দেখলাম তখন স্টার সিনেপ্লেক্সের হলটি ছিল পুরো হাউসফুল! অবাক হয়েছিলাম এত দর্শক দেখে। সেই হিসেবেই এই রিভিউটি লেখা। কিন্তু ‘রইদ’ সিনেমার রিভিউ আসলে একেকজনের দৃষ্টিকোণ থেকে একেক রকম হবে, অন্তত ইতোমধ্যে যারা ‘রইদ’ সিনেমা নিয়ে নানাজনের নানা আলোচনা-সমালোচনা পড়েছেন, তারা সেটি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন।

আমার মতে, ‘রইদ’ সিনেমার বড় সাফল্য হলোÑ মুক্তির তিন সপ্তাহ পরও সিনেমাটি আলোচনার টেবিলে। অনেকেই বলতে পারেন, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমাটি তো ২ মাস পরও আলোচনায় আছে। কিন্তু ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ আর ‘রইদ’ দুটো ভিন্ন জনরার সিনেমা। ‘রইদ’ সিনেমার রিভিউ লেখার জন্য মাথায় অনেক টপিক নিয়েও বসেছিলাম। কিন্তু লেখার সময় মনে হলো সিনেমাটির ভেতরে বার বার রূপক অর্থে ‘তাল’ দেখানো নিয়েই আলোচনা করাটা বেশি সমীচীন। কারণ ‘রইদ’ সিনেমা পুরোটা দেখা যেকোনো দর্শক তার বাকি জীবনে যতবার তাল দেখবেন বা তালের তৈরি পিঠা খাবেন, ততবারই তার ‘রইদ’ সিনেমার কথা মনে পড়বে। আর এটাই হলো ‘রইদ’ সিনেমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা!

তাল গাছ থেকে তাল পড়ার শব্দ, তাল দিয়ে সুস্বাদু একাধিক পিঠা তৈরি কিংবা তাল চুরির ঘটনা প্রভৃতি ‘রইদ’ সিনেমায় বারংবার এসেছে। এর মধ্যে দিয়ে মূলত সিনেমাটির গল্প সাবলীলভাবে এগিয়েছে। দর্শক এতে বিভ্রান্ত হয়নি, বরং তালের সঙ্গে সিনেমার যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করেছে প্রতি মুহূর্তে। ‘রইদ’ সিনেমাটি দেখার সময় তাৎক্ষণিকভাবে আমার মাথায় দুটি বিষয় এসেছে। ১. এই সিনেমাটির দর্শক সবাই না! ২. এই সিনেমাটি দেখতেও এত দর্শক?

‘রইদ’ সিনেমাটি যে কাহিনি, তাতে করে দর্শক এতে প্রতি মুর্হূতে মজা পাবেন না এটা যেমন সত্য, তেমনি সিনেমাটি দেখে ঘরে ফেরার পরও মিনিমাম ২ দিন সিনেমার কাহিনি দর্শকের মাথায় ঘুরতে থাকবে।

একজন পাগলী মেয়ের সঙ্গে নিরক্ষর এক রাখালের বিয়ে, সংসার, বিচ্ছেদের কাহিনিই মূলত ‘রইদ’ সিনেমায় দেখানো হয়েছে। সিনেমাটির সাউন্ড মিক্সিং ও সিনেমাটোগ্রাফি অসাধারণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন লৌকিক অনুষঙ্গ সিনেমাটিতে খুঁজে পাওয়া যাবে। নৌকায় করে মাছদেরকে খাবার দেওয়া, লোকমেলা সহ গ্রামীণ নানা বিষয়কে সিনেমাটিতে তুলে আনা হয়েছে। ফলে সিনেমাটির আর্কাইভাল ভ্যালুও বেশ।

তবে ‘রইদ’ সিনেমাটি নিয়ে আলোচনাই হতো না, যদি না সিনেমাটির দুই মুখ্য চরিত্র নাজিফা তুষি ও মোস্তাফিজুর নূর ইমরান তাদের অনবদ্য অভিনয় প্রতিভা এতে প্রদর্শন না করতেন। আমি তো বলব, আগামী বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য এই দুজনই আমার টপ ফেভারিট থাকবেন। বিশেষত চরিত্রকে এত সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলতে উভয়ের প্রচেষ্টা সত্যিই স্যালুট পাবার যোগ্য।

আর পরিশেষে সিনেমাটির পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন সম্পর্কে দুটি কথা না বললেই নয়। পরিচালককে আমি মূলত চিনি ‘তারপরও আঙুরলতা নন্দকে ভালোবাসে’ শিরোনামের একটি অসাধারণ নাটকের নির্মাতা হিসেবে। আমার ধারণা, এই নাটকে জয়া আহসান তার জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয়টিই করেছিলেন। সুতরাং, তার কাছ থেকে রইদের মতো একটি ভালো প্রোডাকশন আসবে সেটা ভেবেই মূলত সিনেমাটি দেখতে গিয়েছিলাম। বলাবাহুল্য, পরিচালক আমাকে হতাশ করেননি। বরং, আগামীতে আরও ভালো কোনো কাজ তার কাছ থেকে পাব সেই প্রত্যাশাই থাকবে।

লেখক : রেজাউর রহমান রিজভী, অভিনেতা ও নাট্যকার