ঢাকা মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বজুড়ে প্রকৃতির তাণ্ডব 

আরিয়ান স্ট্যালিন
প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২৬, ০৫:৩১ এএম

প্রকৃতির একের পর এক ভয়াবহ আঘাতে বিপর্যস্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে সুপার টাইফুন, ইউরোপজুড়ে দাবানল, যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র দাবদাহ, ভারত ও চীনে প্রবল বর্ষণ এবং ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ ভূমিকম্পÑ সব মিলিয়ে কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে লাখো মানুষ। বিভিন্ন দেশের সরকার জরুরি সতর্কতা জারি করে উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করেছে।

ধ্বংসস্তূপ থেকে বাবা ও দুই ভাইকে জীবিত উদ্ধার : ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও উঠে এসেছে মানবতার অনন্য এক গল্প। ধসে পড়া ভবনের নিচে প্রায় বিশ ঘণ্টা আটকে থাকা এক বাবাকে জীবিত উদ্ধার করেছেন তারই বড় ছেলে, যিনি আগে দমকল বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। নিজের সাবেক সহকর্মীদের সহযোগিতায় দীর্ঘ সময়ের চেষ্টার পর তিনি বাবা ও দুই ছোট ভাইকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন। তবে পরিবারের আরেক সদস্য এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এই ঘটনাটি পুরো উদ্ধার অভিযানের মধ্যে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সুপার টাইফুনে ল-ভ- প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপাঞ্চল :

চলতি বছরের অন্যতম শক্তিশালী সুপার টাইফুন ‘বাভি’ ঘণ্টায় প্রায় ২৯০ কিলোমিটার বেগের বাতাস নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গুয়াম ও উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জে আঘাত হেনেছে। টাইফুনটি সরাসরি রোটা দ্বীপের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ওই এলাকায়। প্রচ- ঝড় ও মুষলধারে বৃষ্টিতে অসংখ্য ঘরবাড়ি, সরকারি স্থাপনা, বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছপালা ভেঙে পড়েছে। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। 

চীন ও ভিয়েতনামে প্রবল বর্ষণ :

সুপার টাইফুনের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া গ্রীষ্মম-লীয় ঝড় চীনের দক্ষিণাঞ্চল ও ভিয়েতনামের বিভিন্ন এলাকায় ভারি বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কোথাও কোথাও ১৩ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। গাছ উপড়ে পড়া, পানিতে ডুবে যাওয়া এবং ভূমিধসসহ বিভিন্ন ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। 

ভারি বর্ষণে বিপর্যস্ত ভারত :

ভারতের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে মৌসুমি বৃষ্টিতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে মুম্বাই ও আশপাশের এলাকায় রাতভর ভারি বর্ষণে সড়ক, মহাসড়ক, রেললাইন ও আবাসিক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। মুম্বাইয়ের পূর্বাঞ্চলে কয়েকটি ভবন ধসে পড়ে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। 

দাবদাহে পুড়ছে যুক্তরাষ্ট্র :

এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র দাবদাহে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে অন্তত ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে নিউ জার্সিতে। দেশটির প্রায় চার কোটি মানুষ চরম গরমের সতর্কতার আওতায় রয়েছে। অনেক শহরে অনুভূত তাপমাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে শত শত মানুষ তাপজনিত অসুস্থতায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।

দক্ষিণ ইউরোপে দাবানলের ভয়াবহ বিস্তার :

ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস ও ইতালিসহ দক্ষিণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবল বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দাবানলের কারণে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কয়েক হাজার হেক্টর বনাঞ্চল এরই মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। 

তাপপ্রবাহে ইউরোপে বাড়ছে মৃত্যু :

জুলাইয়ের শুরুতেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও যুক্তরাজ্যে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফ্রান্সে দাবদাহজনিত মৃত্যু আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। 

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ :

গত মাসে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্পের পর দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ৩৩ শতাধিক ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১৭ হাজার মানুষ। 

জলবায়ু সংকটের কঠিন বাস্তবতা :

বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, দাবদাহ, বন্যা ও ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ নতুন করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, উষ্ণতা বৃদ্ধি, দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, শক্তিশালী ঝড় এবং দাবানলের মতো দুর্যোগ আগামী দিনগুলোতে আরও ঘন ঘন ও আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতাই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা এসব ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, জলবায়ু সংকট আর ভবিষ্যতের নয়Ñ এটি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ।