পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, বেলুচিস্তান নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং প্রদেশের অধিকাংশ এলাকা এখন স্বাধীনতাকামীদের নিয়ন্ত্রণে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতির আবেদনও জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো স্বীকৃত রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থা এই দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি। স্বাধীনভাবে যাচাই করেও এমন কোনো তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে বেলুচিস্তান কার্যকরভাবে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
দীর্ঘদিনের সংঘাতের নতুন অধ্যায় : বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। স্থানীয় জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, তাদের ভূমি, সম্পদ ও রাজনৈতিক অধিকার দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত হয়েছে। এই ক্ষোভ থেকেই বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব সংগঠনের হামলার পরিধি ও সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, সরকারি স্থাপনা, সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক হামলায় পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
স্বাধীনতার দাবির পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ ইেন : সাম্প্রতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি কথিত ঘোষণাপত্র, যেখানে দাবি করা হয়েছে যে বেলুচিস্তানের প্রায় পঁচাশি শতাংশ এলাকা স্বাধীনতাকামীদের নিয়ন্ত্রণে। সেখানে নিজস্ব মুদ্রা, পতাকা, জাতীয় সংগীত এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী এবং প্রাদেশিক সরকার এখনো বেলুচিস্তানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বড় শহর, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণও পাকিস্তানের হাতেই রয়েছে।
সংঘাতের মূল কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা : বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও উন্নয়নের দিক থেকে দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে রয়েছে। প্রদেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তামা, সোনা এবং অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিশাল ভা-ার রয়েছে। স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, এসব সম্পদ ব্যবহার করে দেশের অন্য অঞ্চল উন্নত হলেও বেলুচিস্তানের মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর দিক থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ : বেলুচিস্তানের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে জোরপূর্বক নিখোঁজ, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, গত দুই দশকে বহু ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। অনেকের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ পুরোপুরি স্বীকার করে না। তাদের দাবি, নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত অনেকেই সশস্ত্র সংগঠনে যোগ দিয়েছে অথবা সংঘাতে নিহত হয়েছে। তবে এই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
চীনের বিনিয়োগও সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কারণ : বেলুচিস্তানের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বিশাল অবকাঠামো নির্মাণকে কেন্দ্র করে সেখানে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে। স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এসব প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়েছে। এ কারণে অতীতেও বিদেশি প্রকল্প ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকারের দাবি, এসব উন্নয়ন প্রকল্প বেলুচিস্তানের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
পাকিস্তান কি সত্যিই ভেঙে যাচ্ছে?
সামাজিক মাধ্যমে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়লেও বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বেলুচিস্তানে সহিংসতা বেড়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর বড় ধরনের হামলা হয়েছে এবং সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়েছেÑ এটি সত্য। কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থা সেখানে ভেঙে পড়েছে কিংবা বেলুচিস্তান কার্যকরভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছেÑ এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো এখনো কার্যকর এবং নিরাপত্তা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরেও বাড়ছে অস্থিরতা : এদিকে পাকিস্তানের অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলায় দেশটির নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএকে) এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সংঘাত হয়েছে। এতে ২ জন পুলিশ সদস্য এবং ৭ জন জা’ক কর্মী নিহত হয়েছেন। বুধবার আজাদ কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফফরাবাদ অভিমুখে লংমার্চের কর্মসূচি ছিল জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির; তার আগের দিন মঙ্গলবার পাকিস্তানের এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলটির পুঞ্চ জেলায় ঘটেছে এ ঘটনা।
আন্তর্জাতিক নজর বাড়ছে : বেলুচিস্তান এবং পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরÑ উভয় অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। মানবাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে।
সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত : বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে এই দীর্ঘদিনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সংলাপ, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, মানবাধিকার রক্ষা, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার ছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। অন্যদিকে সশস্ত্র হামলা অব্যাহত থাকলে পাকিস্তান আরও কঠোর সামরিক অভিযান চালাতে পারে, যা নতুন করে সহিংসতার জন্ম দেবে।
বেলুচিস্তান আজও পাকিস্তানের অংশ এবং সেখানে পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক হামলা, স্বাধীনতার দাবি, মানবাধিকার নিয়ে বিতর্ক এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রদেশটিকে নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিয়ে এসেছে। একই সময়ে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অস্থিরতাও দেশটির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে পাকিস্তান এখন একাধিক অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি। এসব সংকটের শান্তিপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করা দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

