আদর-মাখা কোমল এক কণ্ঠ, যে কণ্ঠে বিষাদও যেন নরম হয়ে আসে, আর ভালোবাসা পায় বাড়তি আবেশ। এমনই এক কণ্ঠের নাম মাহতিম শাকিব। দুই বাংলার সংগীতপ্রেমীদের কাছে যিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন বিশ^াসের নাম। তার কণ্ঠে রয়েছে এক ধরনের আত্মিক উষ্ণতা, যা গানকে কেবল শোনার অভিজ্ঞতা নয়, বরং অনুভব করার উপলক্ষে পরিণত করে। মাহতিমের কাছে গান শুধু একটি পেশা নয়; এটি তার আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, যেখানে অনুভূতি, পরিশ্রম ও সততার সম্মিলনে তৈরি হয় এক একটি স্মরণীয় মুহূর্ত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেছেন, জনপ্রিয়তা কখনোই হঠাৎ করে আসে না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ সাধনা, ধৈর্য আর নিজের ওপর অটুট বিশ^াস। মাহতিমের সংগীতযাত্রার শুরুটাও ছিল অনেকটা অনুসন্ধানী। নিজেকে খুঁজে নেওয়ার এই পথচলায় তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন ‘মানসী’ চলচ্চিত্রে সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া কালজয়ী গান ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ নতুনভাবে পরিবেশনার মাধ্যমে। পাশাপাশি রবীন্দ্রসংগীত গেয়েও তিনি শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তখনই অনেকেই বুঝেছিলেন, এই কণ্ঠে আলাদা একটা মায়া আছে, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়ে উঠবে।
এই মায়া নিয়েই ধীরে ধীরে তিনি পা রাখেন মৌলিক গানের জগতে। সেখানে নিজেকে ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়েই তৈরি করেছেন নিজস্ব একটি জায়গা। কলকাতার সিনেমায় ‘তাকে অল্প কাছে ডাকছি’, ‘তুমি জানতেই পারো না’ কিংবা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ‘প্রাণ জুড়িয়ে যায়’, ‘মায়া পাখি’–প্রতিটি গানেই তার কণ্ঠের স্বতন্ত্রতা স্পষ্ট। টেলিফিল্মে ‘বুকের বাঁ পাশে’ অথবা ওয়েব ফিল্মে ‘পাখি পাখি মন’-এর মতো গানগুলোও শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে অনায়াসে। আত্মবিশ^াস আর নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি প্রমাণ করেছেন, সীমান্ত কণ্ঠের জন্য কোনো বাধা হতে পারে না। বিশেষ করে ‘তুমি জানতেই পারো না’ গানটি মাহতিমের কণ্ঠে যেন নতুন এক জীবন পেয়েছে। অনেক শ্রোতার মতে, এই গানটির জন্য তার কণ্ঠই সবচেয়ে মানানসই। কলকাতার সিনেমা চিনি ২-এ ব্যবহৃত এই গানটি মুক্তির কয়েক মাসের মধ্যেই ইউটিউবে কোটি ভিউ অতিক্রম করেছিল। শুধু ভিউ নয়, মন্তব্যের ভিড়েও স্পষ্ট ছিল শ্রোতারা গানটিকে আপন করে নিয়েছেন হৃদয় দিয়ে।
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, টিকটক কিংবা ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের রিলসÑ সবখানেই গানটির উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই গানটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাহতিমের জীবনের একটি আবেগঘন গল্পও। তিনি জানান, প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবেই গানটি গাওয়ার প্রস্তাব আসে। সময় ছিল খুবই অল্প, মাত্র দুই দিনের মধ্যে কণ্ঠ দিতে হবে। কিন্তু গানটি শোনার পরই তার মনে হয়েছিল, এই গানটি যেন তার নিজের গল্প বলছে। শ্রোতারা কীভাবে নেবেন, সেটার চেয়েও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের পোর্টফোলিওতে একটি ভালো গান যুক্ত করা। শিল্পীর জীবনে এমন অনুভূতি বারবার আসে না; এই সত্যিটুকু তিনি অকপটে স্বীকার করেন।
গানটির সাফল্যে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন তার মা-বাবা। পরিচিতজনেরা ফোন করে প্রশংসা জানালে সেই আনন্দে গর্বিত হয়ে ওঠেন মাহতিমও। এর আগেও কলকাতার ছবিতে তার গাওয়া ‘তাকে অল্প কাছে ডাকছি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ফলে অনেক শ্রোতাই ইউটিউবে গান শুনে ভেবে বসেন গায়ক নিশ্চয়ই কলকাতার কেউ।
অথচ বাস্তবে তিনি বাংলাদেশেরই একজন তরুণ শিল্পী, যিনি সীমান্ত পেরিয়ে কণ্ঠের মাধুর্য দিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন দুই বাংলার মানুষের হৃদয়ে। এই জনপ্রিয়তার মাঝেও মাহতিম থেমে থাকতে চান না। তার স্বপ্ন আরও দূরে। তিনি স্বপ্ন দেখেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস জয়ের। বিশে^র অন্যতম সম্মানজনক সংগীত পুরস্কার গ্র্যামি শুধু একটি ট্রফি নয়, এটি একজন শিল্পীর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রতীক। ১৯৫৮ সালে প্রবর্তিত এই পুরস্কার সংগীতশিল্পে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে আসছে যুগের পর যুগ। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের নাম উচ্চারণ হতে দেখার স্বপ্ন মাহতিমের চোখেও জ্বলে।
গ্র্যামি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি দৈনিক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের জায়গা থেকে বিষয়টা ভীষণ কঠিন। অসম্ভব নয়, তবে প্রচ- কঠিন। আন্তর্জাতিক কোনো লেবেল কোম্পানির সমর্থন, যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিকভাবে গান প্রকাশÑ এমন অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়।’ তবু স্বপ্ন ছাড়তে নারাজ তিনি। তার বিশ^াস, কাজের প্রতি সৎ থাকলে সৃষ্টিকর্তা নিজেই পথ খুলে দেন। মাহতিম খুব বেশি রোডম্যাপিং করে এগোন না।
আজকের কাজটা ঠিকভাবে শেষ করাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগামী পাঁচদিনের পরিকল্পনা থাকলেও বহু বছর পর কোথায় পৌঁছাবেন, সেই সময়রেখা তিনি টেনে রাখেন না। তার ভাষায়, ‘সব কিছুই নির্ভর করে পরিশ্রম আর ভাগ্যের ওপর।’ এই বিশ^াস, সততা আর পরিশ্রমই হয়তো একদিন তাকে নিয়ে যাবে তার স্বপ্নের সেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে, যেখানে একটি কোমল কণ্ঠ হয়ে উঠবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন